রাজকুমার ঘোষ -
জীবনের চল্লিশটা বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাজীববাবুর জীবনে
যেন অন্যরকম হাওয়া। হঠাৎ করেই যেন ওনার জীবনে এক মিষ্টি হাওয়ার অনুপ্রবেশ। এই মিষ্টি
হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিতে কে না চায়! রাজীববাবুও তাই ভাসিয়ে দিয়েছেন এক মিলন মেলায়। হ্যাঁ
মিলনমেলা, বন্ধুত্ত্বের
মিলনমেলা। স্কুল জীবনের বন্ধুরা হঠাৎ করে ফিরে আসে তার জীবনে, এবং এক অভুতপূর্ব মিলনমেলা। আবেগে
ভেসে গেছেন চূড়ান্ত ভাবে। তারপর তাদেরই মধ্যে কিছুজন মিলে একটি এন.জি.ও গঠন এবং কিছু
সামাজিক কাজকর্ম। সব মিলিয়ে এক নিদারুন খুশির হাওয়া।
বন্ধু শব্দটা ভীষণ গভীর। রাজীববাবু একদিন বিছানায় শুয়ে
ভাবছেন তিনি সত্যিই ভাগ্যবান। তার কোনো প্রিয় বন্ধু নামে বিশেষ কেউ ছিলো না বা থাকবেও
না। সকলেই তার প্রিয় বিন্ধু। ছোটবেলা থেকেই তার খেলাধুলা, স্কুল, কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে অসংখ্য বন্ধুর
সাথে পরিচয় হয়েছে, কিন্তু প্রিয় বন্ধু তো বিশেষ কেউ নয়। সবাই যে যার সময়ে প্রিয় বন্ধু, তাদের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলোই ভীষণভাবে
প্রিয়। তাই বন্ধু তকমা, অনেক সময় কিছু অচেনা, অজানা কাউকেও অনায়াসে দেওয়া যায়। স্মৃতিতে ঠাসা অনেক কিছু ঘটনার মধ্যে রাজীববাবুর
এক অচেনা বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল......
আঠেরো বছর আগের কথা, সদ্য কলেজ থেকে পাশ করে রাজীববাবু বেরিয়েছেন, আর একটা চাকরীও তার জুটে গেল, এক নামকরা ব্যাটারী কোম্পানীর সার্ভিস
ইঞ্জিনীয়ার । কাজের সূত্রে মাঝে মাঝেই দূরপাল্লার বাস বা ট্রেনের শরণাপন্ন হতে হোত
। হঠাৎই একদিন ঠিক হয়ে গেল যে, জরুরী কাজে ওনাকে পাটনা যেতে হবে। রিজার্ভেশন না হওয়ায় উনি ওই দিন ঠিক রাত ন’টায়
দানাপুর এক্সপ্রেসের জ়েনারেল কামরাতে হাওড়া থেকে উঠে পড়লেন। জীবনে প্রথম বার তিনি
জ়েনারেল কামরাতে উঠলেন তাও দানাপুর এক্সপ্রেসে। জেনারেল কামরাতে যে কি বিশ্রীরকম অবস্থা
তা ওনার ধারণার বাইরে, কোনরকম ঠেলা, গোত্তা সামলে উনি একটি কামরায় উঠেছেন এবং একটা না বসেও বসার মতো সিট পেয়েছেন
তাও খুব ভাগ্যের ব্যাপার, পুরোপুরি কোনঠাসা হয়ে গেছেন।
একটি সিটে আধবসা অবস্থায় বসে কামরায় উপস্থিত মানুষগুলোর
মুখগুলো উনি ফ্যালফ্যাল করে দেখছিলেন আর ভাবছিলেন আগামীকাল তিনি ঠিক পৌছতে পারবেন তো? হঠাৎই ওপর থেকে একজন বলে উঠল, “ভাইয়া, কাহাতক যাওগে?”…… ভগবান মনে হয় ওনার ভাবনাতে
সাড়া দিয়েছেন, তাই উপরের দিকে তাকালেন, দেখলেন একটা ছেলে আপার বার্থে বসে আছে এবং তাকেই জিজ্ঞাসা করছে । উনি বললেন
- পাটনা যাব। সেই ছেলেটি মিষ্টি হেসে তার দখল করা বার্থে ওনাকে যেতে অনুরোধ করল। উনি
তখন ওনার লাগেজ নিয়ে ওই ছেলেটির দখল করা আপার বার্থে চলে গেলেন। ছেলেটির সাথে কথা বলাতে
জানতে পারলেন, ছেলেটি বড়বাজার চত্ত্বরে মুটে-মজুরের কাজ করে। বোনের বিয়ের জন্য বাড়ি যাচ্ছে।
ট্রেন দশটার সময় হাওড়া থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর রাজীববাবু
তার সাথী ছেলেটির সাথে কথা বলছিলেন এবং পরে
ওনারা নিজেদের মধ্যে খাবারও শেয়ার করে নিয়েছেন। উনি ওনার মা-এর করে দেওয়া লুচি-তরকারী ও কেনা মিষ্টি ছেলেটিকে
নিতে বললেন। কিন্তু ছেলেটি বেশ লাজুক, নিতে চাইছিল না। অনেক অনুরোধ করাতে শেষে নিল। ঘুমোনোর জায়গার অভাব তাই খাওয়া হয়ে যাবার পর উনি ছেলেটি এবং ছেলেটির
কিছু চেনা সাথীর সাথে কথায় মশগুল হয়ে গিয়েছিলেন, যাতে সময়টা কেটে যায়। তারপর রাত বাড়তে
বাড়তে ট্রেন কখন যে বাংলা সীমানা পেরিয়ে বিহারে ঢুকে গেছে সেটা উনি টের পেলেন ট্রেনে
কিছু বিহারী গ্যাং-এর বাঁদরামী দেখে। তারা কেন জানিনা অজস্র গালিগালাজ করতে লাগল বাঙালীদের, তারা তো পুরো বাঙালী জাতটাকে পারলে
মাটির তলায় পুঁতে রাখতে চায়। একটা অদ্ভুত ভয়ের পরিস্থিতির মধ্যে রাজীববাবু পড়ে গিয়েছিলেন,
তার ওপর আবার ওনাকে দেখে ওদের উৎসাহ আরো বেড়ে গিয়েছিল। ওরা চারজন ওনার কাছে এসে উল্টোপাল্টা
কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগল, তাদের মধ্যেই একজন ওনার পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট ও দেশলাই নিয়ে নিলো, এরপর ওনার লাগেজ দেখতে যাবে কি! ...
ছুটে চলে এলো ওনার গতরাতের সাথী সেই ছেলেটি। সে বেশ রেগে গিয়ে ঐ গ্যাং-গুলোর দিকে তেড়ে
গেল, এবং ওর আরো
জনা-দশেক সাথী ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তাদেরকেও সে ডেকে নিলো। এরপর ওই বাঁদরগুলো
কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না। ছেলেটি রাজীববাবুকে আশ্বাস দিল, “ভাইয়া, ডরো মত, হাম সব হ্যায়”। ......... এমন আশ্বাস পেয়ে ওই সময় রাজীববাবুর দুচোখ বেয়ে
জল চলে এলো। নিজের মনে মনে বললেন, ‘ভগবান, তুমি সত্যি, কতো রূপে আছো’। এমন একটি ঘটনার পর উনি এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, না চাইলেও ওনার চোখে ঘুম এসে গেল।
“ভাইয়া উঠো, হামলোগ পাটনা আগেয়ে” – বিহারী সাথী ছেলেটির ডাকে রাজীববাবু উঠে পড়লেন, তারপর ছেলেটি ওনার লাগেজ বার করে
প্লাটফর্মে নামালো তারপর সেখান থেকে ওনাকে অটোস্ট্যান্ডে নিয়ে এল, একটা অটোকে ডেকে গন্তব্য জিজ্ঞেস
করে ওনাকে অটোতে বসিয়ে “ভাইয়া, টাটা” – বলে ভীড়ের মধ্যে মিশে গেল । হতভাগা ছেলেটি রাজীববাবুকে
সুযোগ পর্যন্ত দিল না ওর নামটা কি, সেটা জানার, বাকি ফর্মালিটি তো পরের ব্যাপার। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। অটোরিক্সাও ওনাকে পাটনার
সাউথ গান্ধী ময়দান পেড়িয়ে ওনার গন্তব্যস্থলে পৌছে দিল।
আঠারো বছর পরেও রাজীববাবু সেই বিহারী সাথী ছেলেটিকে অচেনা
বন্ধু হিসাবেই ওনার ঠাসা স্মৃতিতে একটা রঙীন পাতা হিসাবে রেখে দিয়েছেন। সেই অচেনা বন্ধুটি
মাত্র দশ ঘন্টায় ওনার পরম প্রিয় বন্ধু হয়ে গিয়েছিল, যাকে উনি ভগবানের দূত বলতেও দু’বার ভাবেননি।
প্রকাশিত -পদক্ষেপ পত্রিকার মে-জুন ২০১৮ সংখ্যা
No comments:
Post a Comment