Showing posts with label আমার লেখা বড় গল্প. Show all posts
Showing posts with label আমার লেখা বড় গল্প. Show all posts

Friday, June 16, 2023

ভৌতিক গল্পঃ মাঝরাতে হাতছানি

 


মাঝরাতে হাতছানি
রাজকুমার ঘোষ

স্বপ্ননীল ঘোষ, লেখক হিসাবে বেশ নাম ডাক হয়েছে। বেশ কয়েকটি উপন্যাস, গল্প এমনকি কাব্যগ্রন্থ পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে সবই প্রেম, বিরহ, বেদনা, সামাজিক, পারিবারিক বিষয় নিয়ে লেখা। খুব জোর সাসপেন্স থ্রিলার নিয়ে তিন-চারটে গল্প লিখেছেন। কিছুদিন যাবৎ একটি প্রকাশনা সংস্থা তাদের ভৌতিক সংকলনের জন্য ওনার থেকে ভৌতিক ব্যাপার নিয়ে লেখা চেয়েছে। সংকলনের নামকরণ হবে “মাঝরাতের হাতছানি”। স্বপ্ননীলবাবু বেশ ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। প্রকশনী সংস্থা থেকে জোর অনুরোধ এসেছে একটা গল্প লিখতেই হবে। আগের সকল সংকলনে ওনার লেখা ছিল। কাজেই এবারেও ভূত নিয়ে তাদের লেখা চাই...চাই।
কিন্তু লেখক মহাশয় সেভাবে ভূতের গল্প কোনোকালেই লেখেননি। বলা ভালো অপার্থিব বিষয় নিয়ে ওনার লেখা আসে না। তবে ভূতের গল্প পড়েছেন বা সিনেমাও দেখেছেন, হয়তো ভয়ও পেয়েছেন। আবার খুব যে পেয়েছেন তাও না। কিন্তু ভূতের গল্প লিখতে গিয়ে কিছুতেই লেখা আসেনা। সম্পাদকের উপর রাগ দেখিয়ে মনে মনে বললেন,
“বেছে বেছে যত ফালতু বিষয়বস্তু। সম্পাদক পারেও বটে। বলে কিনা পাবলিক ডিমান্ড”
সম্পাদকের আজ্ঞবহ হয়ে যথারীতি ভূতের গল্প লেখার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছেন। একে একে গা ছমছম করা বনে বাদাড়ে, নিঃশব্দ, নিঃস্তব্ধ গ্রামের মধ্যে পোড়ো বাড়ি থাকলে সেখানেও গিয়েছেন, এমনকি বেশ কিছু মন্দিরে পুজো দিয়েছেন যাতে করে জম্পেশ দু-চারটে ভূতের গল্প লিখতে পারেন। তবুও একটা ভূতের গল্প এল না। শুধু মানুষ ভূতের কথা লেখায় চলে আসে। নিজের উপর স্বপ্ননীলবাবুর বিরক্তি চলে আসছে। এমনকি গতকাল রাত দু’টো পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন কিন্তু না, ভূত নিয়ে একটা শব্দও আসেনি। মনে মনে বললেন,
“দূর ছাই, আর লিখবো না। সম্পাদক যা বলার বলবে, রাগ করলে করবে। যাই, ভালো করে ঘুমোতে যাই। তার চেয়ে আগামীকাল সকাল থেকে আমি আমার স্বাভাবিক সত্ত্বায় ফিরে আসব। কবিতা এবং ছোট-বড় বিভিন্নরকম গল্প নিয়েই না হয় আমি নিজের ছন্দে নিমজ্জিত থাকব। এইসব অবাস্তব বিষয় একদম না!”
এরপর স্বপ্ননীলবাবু স্টাডি রুমের লাইট নিভিয়ে বাড়ির দোতলায় শোবার ঘরে যাবার আগে একটু বাথরুমেও ঘুরে এলেন, হ্যাঁ অবশ্যই অন্ধকারে, তারপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাড়ির ছাদেও গেলেন। বাড়ির ছাদের আকাশ আজ যেন ঘন কালো। কিছুদিন আগে কালীপুজো চলে গেছে। জগদ্ধাত্রী পুজোও কেটে গেছে। বেশ শীতের আমেজ আসছে। গায়ে একটা পাতলা জামা পড়ে আছেন। ছাদের আশেপাশে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারকেই ভেবে নিলেন একটা ছায়ামূর্তি যেন ওৎ পেতে বসে আছে ওনাকে ভয় দেখাবে বলে। সিনেমায় দেখা একটা ভৌতিক মুখ কাল্পনিক ভাবে ওনার মনে ছকে নিয়ে নিজের মনেই বললেন,
“কিরে ভূত, আমার ঘাড় মটকাবি নাকি? সাহস থাকলে সামনে আয় দেখি, কেমন তোর সাহস?”
কিন্তু অসফল প্রচেষ্টা। তেনাদের কারোর দেখা নেই। ভাবলেন তেনাদের কোনো প্রতিনিধি এসে একটা ভূতের গল্প লেখার প্লট দেবে। এরপর নিজের অজান্তেই ছাদের একটা ধারে দাঁড়িয়ে বেশ দূরে একটা পোড়ো বাড়ি আছে, সেইদিকে তাকিয়ে রইলেন। যেখানে দীর্ঘদিন কেউ বাস করেনি। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলার সময় সেই বাড়িতে গিয়ে অনেকবার লুকিয়েছেন। সেই বাড়ির দিকে তাকিয়েই উনি টাটা করে হাঁকলেন,
“টাটা গো অন্ধকারের মানুষজন, পারলে আমাকে ভয় দেখাও দেখি! যদি কিছু মনের মধ্যে গল্প চলে আসে। আর তাও যদি তোমার সম্মানে লাগে। কাছে এসে ঘাড় মটকিয়ে দেখাও দেখি!”
কিন্তু কোথায় কি? স্বপ্ননীলবাবু হতাশ হয়ে কালো অন্ধকারে হাতরে হাতরে নিজের শোবার ঘরে ঢুকে পড়লেন। তারপর ঘরের কম পাওয়ারের লাইট জ্বেলে অভ্যাসবশত বিছানার পেছনের দিকে রাখা আয়নায় নিজের মুখমন্ডলটি দর্শন করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কিন্তু হঠাৎই তার মনে হলো,
“সত্যি তো! আয়নায় আমি কী দেখলাম? আমি কি আমার মুখের অবয়ব সত্যি কি দেখতে পেলাম!”
এবার কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করলেন। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। না চাইলেও একটু একটু ভয় পেতে থাকলেন। ওনার মনে হলো,
“আয়নার যখন নিজের মুখ দেখতে গেলাম, কিছুই দেখতে পেলাম না। কি জানি, মনের ভুল হবে বোধ হয়”
হালকা গা শিরশিরানি শীতেও ওনার গায়ে বেশ ঘাম চলে এল। জল পান করতে গিয়ে জলের বোতলটি তুলতে গিয়েছেন, কিন্তু কিছুতেই তুলতে পারছেন না। বোতলটি তোলার ব্যর্থ প্রচেষ্টা!
“কি হলো আমার সাথে? কিছুই মাথায় ঢুকছে না। সব মাঝরাতের হাতছানি নাকি। এমন তো কোনোদিন হয়নি। ভূতের গল্প লেখা মাথায় থাক বাবা... আর নয়। অনেক হয়েছে”
স্বপ্ননীলবাবুর শিড়দাঁড়া দিয়ে যেন হালকা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন বিকল হয়ে যাচ্ছে। উনি ঘরের লাইট জ্বালাতে গেলেন। কিন্তু কেমন যেন দুর্বল লাগলো। সামান্য সুইচও অন করতে পারছেন না!
“হলো কী আমার?” নিজের মনেই জিজ্ঞেস করে অনুভব করলেন নিজের হৃদস্পন্দনের মৃদু আওয়াজ হঠাৎ শব্দ সহকারে কানের মধ্যে প্রবেশ করছে। উনি ভয়ে কানে হাত দিয়ে দিলেন। এদিক ওদিক ভাবতে ভাবতে পরিশেষে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লেন, মনে হলো ওনার লাশটা ঝুপ করে আওয়াজ করে টলে পড়ল বিছানায়। চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা বনবন করে কি যেন ঘুরতে থাকা চাকতির মতো, তীক্ষ্ম শব্দে ওনার মাথাকে আরও ভারী করে দিচ্ছে। ওনার কিছুই ভালো লাগছে না। শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভূত হছে। এরপর আচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লেন।
কিন্তু এক ঘন্টা পর ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গিয়ে ওনার মনে হলো বাড়ির লোকজনের ভয়ার্ত গলা। বেশ শোরগোল। সবাই কেন চেল্লাচ্ছে বুঝতে পারছেন না। ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির নিচে চলে এলেন ওনার স্টাডি রুমের কাছে। দেখলেন, বাড়ির সবাই সেই ঘরে হাজির। বেশ কিছু প্রতিবেশীও এসেছে। সবাইকে কাঁদতে দেখে ভীষণ চিন্তিত হয়ে বাড়ির অন্যঘর গুলো দেখলেন। সেই ঘরগুলোয় কেউ নেই। বাবা-মা’কে দেখতে না পেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। আবার স্টাডি রুমে ফিরে এসে দেখলেন বাবা-মা কাঁদছেন। তাহলে কার কি হল? সকলে কাঁদছে কেন? অবাক করার মত ব্যাপার, কাউকে ঠেলতে হলো না। স্বপ্ননীলবাবু সবাইকে ভেদ করে স্টাডি রুমের মধ্যে এসে একটু উঁকি দিতেই ওনার চক্ষু চড়ক গাছ! মনে মনে বললেন,
“একি দেখছি আমি?”
ওনার গা হাত পা ঠান্ডা হওয়ার উপক্রম। দেখলেন, ওনার নিস্তেজ দেহটা পড়ে আছে স্টাডি রুমের ঘরে। আর সেই দেহটি আঁকড়ে ধরে আছে ওনার বোন। ডাক্তার নাকি আগেই এসে দেখে গেছে। সকলের বলাবলিতে জানতে পারলেন, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে ওনার মৃত্যু ঘটেছে।
সমস্ত ব্যাপারটা প্রত্যাশিত না, কাজেই এমন একটা মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে ওনার মাথাটা কেমন যেন বনবন করে ঘুরতে লাগল। স্বপ্ননীলবাবুর এবার বেশ ভয় ভয় করছে। নিজেকে বেশ অসহায় মনে হচ্ছে। সামান্য ভূতের গল্পই তো লিখতে চেয়েছিলেন উনি। তার পরিণতি এমন ভয়াবহ হবে তা কল্পনার বাইরে। ঠিক এমন সময় দূর থেকে একটা বজ্র কঠিন চাপা গলায় এক ছায়ামূর্তি কোথা থেকে ওনার দিকে ধেয়ে এসে বলল,
“আমাদের দুনিয়ায় মাঝরাতের হাতছানিতে সুস্বাগতম লেখক। আপনার আমন্ত্রণ না রাখতে পারলেও আশা করি আমাদের আমন্ত্রণ আপনি নিশ্চয়ই রাখবেন”
সমাপ্ত

Saturday, August 27, 2022

বড়গল্পঃ- শিকড়



রাজকুমার ঘোষ 

অনেক পুরোনো মধুর স্মৃতি নিয়ে প্রায় এক যুগ পর গ্রামে আসছে ডাঃ সাগর চট্টোপাধ্যায়। শিকড়ের টান যে তাকে বারেবারে হাতছানি দেয়নি তা নয়, সে তো আসতে চায় তার ছোটবেলায় কাটিয়ে যাওয়া এই হরিশপুর গ্রামে। তাদের রাজকীয় বসতবাড়ী, তার সাথে সংলগ্ন সবুজে ঘেরা গ্রাম্য জগৎ, চারিপাশে যেদিকে তাকায় ধান, সরিষার ক্ষেত, দু তিনটে পুকুর, ঠাকুর দালান এবং সর্বোপরি তার বাল্যবন্ধুদের সাথে কত আড্ডা... আজ শুধু স্মৃতির মণিকোঠায় জ্বলজ্বল করছে। গ্রামের রাস্তা ধরে তার বিলাস বহুল গাড়িটা যখন তাদের বসত বাড়ির দিকে ঢুকছে, সকলে অবাক পাণে তাকিয়ে রয়েছে... ছোট ছোট ছেলেগুলো হৈ হৈ করে গাড়িটির পেছনে ছুটে চলেছে। সাগর নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, তার পাশে থাকা স্ত্রী রমা ও ছেলে রকিকে তার গ্রামের কথা মুগ্ধ নয়নে বলে চলেছে। বাড়ির সামনে আসা মাত্রই সাগরের ছোটকাকা নারায়নবাবু বেড়িয়ে এলেন, তার সাথে ছিল তার ছোটবেলার দুই বন্ধু শিবেশ ও উমাপতি। সাগর এদের সাথে তার স্ত্রী ও ছেলের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
দুপুরে খাওয়া শেষে সাগর দুই বন্ধু শিবেশ ও উমাপতিকে নিয়ে বসলেন বাড়ির বৈঠক খানায়, যেখানে বসে একসময় দাদু, বাবা কাকারা গ্রামের উন্নয়নের জন্য গ্রামের লোকেদের সাথে কথা বলতেন। সেখানে বসে ওরা ওদের ছোটবেলায় ফিরে গেলেন নিমেষে। একে একে তারা বলতে লাগল স্কুলে যাবার সময় পুকুর পাড়ে বসে মাছ ধরা... ডাংগুলির ম্যাচ, এর ওর গাছে ভালো কিছু ফল পেলেই সেগুলো নিজের করে নেওয়া এবং পুজো পার্বনগুলোয় একসাথে চুটিয়ে আড্ডা... মেলায় যাওয়া, কতরকম খাওয়া-দাওয়া এবং খেলা কেনা সবকিছু। এতকিছুর মধ্যেও সাগর ভোলেনি সেইসময় গ্রামের খুবই পুরোনো লোক হরিদাদুর কথা, এই দাদুর সাথে ওদের সম্পর্ক খুবই নিবিড় ... যাকে বলে আদা-কাঁচকলায়... সেই সময় সাগরের পয়লা নম্বর শত্রু ছিল এই হরিদাদু... সেই প্রসঙ্গেই সাগর শিবেশকে
- হরিদাদুর কথা কিন্তু আমি এখনো ভুলিনি
- তোর হরিবুড়োর কথা মনে আছে?
- মনে আবার থাকবে না? ছোটবেলার চরম শত্রুকে কেউ ভোলে? দাদুর কি খবর?
উমাপতি বলে
- হরিদাদুর ছেলেপুলে তো কেউ ছিলো না। দুই মেয়ের বিয়ে তো সে কোন কালে হয়ে গেছে? শেষ বয়সে পাগল হয়ে যায়। দেখার কেউ ছিলো না, তোর বাবাই সেই দায়িত্ব নেয়। ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। ওনার সম্পত্তি ওনার আত্মীয়রা এসে কোনো একজনকে বিক্রি করে দেয়।
সাগর খেয়াল করেছে হরিদাদুর বসতবাড়ীটা বেশ সাজানো গোছানো। ওর মনে আছে বাড়ির বাগানে আমগাছগুলো ছিলো, ভালো আম হত সেখানে, ওরা সেই আমগুলো গাছে উঠে পেড়ে নিতো। পেয়ারাগাছ গুলোতে বেশ ডাঁসা পেয়ারা থাকতো। একদিন দাদুর হাতে সাগর ধরা পরে গিয়েছিলো। ওর বাবাকে দাদু নালিশ করেছিলো এবং তার জন্যে বেধরক ঠ্যাঙানি দিয়েছিলো। তা মনে করেই সাগর
- মনে আছে বাবাকে নালিশ করে দাদু আমাকে ঠ্যাঙানি খাইয়েছিল।
শিবেশ বলল- সে আবার মনে থাকবে না? তারপর বদলা নেবার প্ল্যান কেমন নিলাম এবং সফলও হলাম।
এইসময় রমা প্রবেশ করল হাতে চা এর ট্রে নিয়ে
বদলা! কার জন্য বদলা আর কিসের প্ল্যান!
- বৌদি, ছোটবেলার স্মৃতিচারণ... সে এক দিন ছিল, আমরা তিনজন সেইদিন গুলোর কথা মনে করছি।
- তা আমাকেও কি বলা যায় না?
উমাপতি বলল-
নিশ্চয়ই, শুনুন তবে.........
তখন সাগর আর ওর বন্ধুরা মিলে পাশের বাড়ির হরিদাদুর বাগানের গাছ থেকে আম, পেয়াড়া চুরি করতে গিয়ে একদিন হরিদাদুর হাতে ধরা পড়ে গেলো। হরিদাদু সাগরের বাবাকে নালিশ করাতে ওর বাবা সেদিন ওকে প্রচন্ড ঠাঙানি দিয়েছিল। সাগর তারই বদলা নিয়েছিল।
সেইসময় প্রতিদিন ভোরবেলায় দাদু বাগান সংলগ্ন পুকুরে স্নান করতো, স্নান করার পর সূর্য প্রণাম করত। দাদু তার আন্ডার প্যান্টটা রাখতো পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে, সেই সুযোগটা সাগররা কাজে লাগিয়েছিল। সাগর বেছে বেছে অনেক কাঠ পিঁপড়ে যোগাড় করেছিল। কোন একটা দিন দাদু যখন পুকুরের জলে ডুব দিয়ে উঠে সূর্য প্রণাম করছিল, ঠিক সেইসময় ও গোটা দশেক পিঁপড়ে দাদুর আন্ডার প্যাণ্টের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ব্যাস তারপর দেখে কে! স্নান করার পর দাদু তার আন্ডারপ্যান্ট পড়ল, কিছুক্ষণ পরেই দাদুর ভয়ংকর রকম লাফালাফি শুরু, দাদু কোনরকমে প্যান্টটা ছেড়ে সাগরের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিল তারপর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। এরপর সাগরের বাবা দাদুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। দাদু প্রায় পাঁচদিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেননি। পরে জেনেছিল ব্যাপারটা কি, এবং সাগরকে ওর বাবা তার উপযুক্ত শাস্তিও দিয়েছিলেন।
রমা সাগরের দিকে তাকিয়ে- তুমি এতটা দুষ্টু ছিলে? ভাবা যায় না। এখন রকিকে শাসন কর... সত্যি! ভাগ্যিস এখানে এলাম তাই জানতে পারলাম।
- বৌদি আরো আছে... অবাক হওয়ার কিছুই নেই। - উমাপতি বলা শুরু করল...
এরপর সাগর শাস্তি পেয়ে শান্ত একদমই হলো না বরং ও আরো বেশী জেদী হয়ে গেল। রাগে ও আরো ভয়ংকর কিছু প্ল্যান করতে লাগলো এবং তা করে ফেললো। ও গ্রামের হাট থেকে লঙ্কা গুড়ো নিয়ে এলো। দাদু নস্যি নিতো, একদিন দাদুর বাড়িতে গিয়ে নস্যির ডিব্বার মধ্যে লঙ্কার গুঁড়ো মিশিয়ে দিল। দাদু যেই নস্যি নাকে নিয়েছে, আর দেখতে নেই, হেঁচে হেঁচে তার চোখ মুখ লাল হয়ে গেলো এবং তার নাক ফুলে ঢোল হয়ে গেল। প্রায় সপ্তাহ খানেক দাদু বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি। সাগরের বাবা এরপর ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সাগর রাগে ওর মামাবাড়ি চলে গেল। প্রায় চার মাস পর কালিপুজোর আগে ওর বাবাই ওকে নিয়ে আসে।
কালীপুজোর পর এসে সাগরের নতুন প্ল্যান হলো ছুচোবাজি তৈরী করে একটু নতুন ধরনের বদলা। হরিদাদু রাত নটায় খেয়ে নিয়ে শোবার জন্য লুঙ্গি পালটে শুতে যায়। সাগর একটা ছুচোবাজি জ্বালিয়ে দাদুর সেই লুঙ্গি তাক করে ছেড়ে দেয়। সেই ছুচোবাজি সোজা গিয়ে দাদুর লুঙ্গির ভেতরে ঢুকে যায়। রাতবিরেতে সে এক ধুন্ধুমার কান্ড। সাগরের বাবা-কাকারা ছুটে গিয়ে দাদুকে ধরে ফেলে কম্বল চাপিয়ে দেয়। দাদুর যা হবার তা হয়ে গেছে। এরপর ওর বাবা সাগরের ওপর ভীষণ রেগে গিয়ে ঐ দিন রাতেই ঘর থেকে বের করে দেয়। সাগর সারারাত ঘরের বাইরে কাটায়। এমনকি কোন বন্ধুর বাড়িতেও যেতে চায়নি। পরের দিন সাগরের বাবা বললেন, ‘ও আমাদের বাড়ির কুলাঙ্গার, ওর শিক্ষা হবে না। ওকে হোস্টেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। ওকে রহড়া রামকৃষ্ণে ভর্তি করে দেয়। সেই যে সাগর গ্রামছাড়া হল, এতদিন পর ও ফিরে এলো।
প্রায় দশ মিনিটের মতো এরপর নিস্তব্ধতা। উমাপতি ও শিবেশের কাছে রমা সাগরের এই কীর্তিকলাপ শুনে যারপরনাই হতভম্ব। সাগরই সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলল - এরপরের ঘটনাগুলো এবার আমাকে বলতে দে। এতক্ষণ ধরে তোরা সব বললি......
সাগরের বাবা ওকে রহড়ায় রেখে চলে আসেন। পুরো স্কুল লাইফটা সাগর ওখানেই কাটিয়ে দেয়। ওখানে ভালো রেজাল্ট করে ওর ডাক্তারী নিয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু সেইসময় ওর বাবা-কাকাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। সেইসময় হরিদাদু প্রায়ই সাগরের বাবার কাছে ওর খোঁজখবর নিতেন। একদিন ওর বাবার সাথে ওর কাছে এসেওছিলেন, ওকে গ্রামে নিয়ে যাবার জন্য বলেওছিলেন। কিন্তু সাগর আর ফিরে যায়নি। সেদিন রাতের ঘটনার পর ওর বাবার কুলাঙ্গারশব্দটা ওকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। ঠিকই করেছিল জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েই গ্রামে ফিরবে। স্কুলে ভালো রেজাল্ট করার পর ও একটা স্কলারশিপ পেয়েছিল, যেটা হল রাশিয়ার একটা নামকরা কলেজে ডাক্তারী পড়ার সুযোগ। ওখানে যাবার খরচা ও প্রাথমিক অ্যাডমিশনের জন্য বিরাট অঙ্কের টাকার প্রয়োজন ছিল। বাকি ওখানে পাঁচ বছর পড়াশোনা এবং থাকার খরচা ওদের। এইরকম সুযোগ বারবার আসেনা। ওর বাবা অনেক চেষ্টা করেও তা যোগাড় করতে পারেনি। এরপর হরিদাদু এগিয়ে আসে, ওর বাবাকে বলে নাতির ভালোর জন্য ওনার বসতবাড়িটা বিক্রি করতে চায়। ওর বাবা রাজি হয়নি। কিন্তু হরিদাদু নাছোড়বান্দা। শেষমেষ হরিদাদুর সৌজন্যে সাগর রাশিয়ায় যায়।
সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সাগরের কাছে এতো কিছু শোনার পরে। এরপর সাগর বলে - এই ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারবো না। তাই এসে আমি তোদের কাছে হরিদাদুর কথা বারবার শুনতে চেয়েছি । রাশিয়ায় যাবার পর আমার জগত অন্যরকম হয়ে যায়। সেভাবে কারোর খোঁজ খবর নিতে পারিনি। বাবার সাথে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতাম। তোরাও আমাকে ক্ষমা করিস। আমি তোদের কারোর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারিনি। ডাক্তারী পাশ করার পর আমি ওখানে একবছর এক হাসপাতালে প্র্যাক্টিস করি। তারপর আমি ফিরে আসি কলকাতায়। বাবাও আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আর গ্রামেও আসা হয়ে ওঠেনি।
শিবেশ বলল,
- তুই আমাদের খবর না রাখলে কি হবে। আমরা রাখি। আমাদের বন্ধু ডাঃ সাগর চট্টোপাধ্যায় কলকাতার একজন প্রথম সারির হার্ট সার্জেন, সেটা কি জানি না ভেবেছিস। তুই যে এখানে এসেছিস শেষপর্যন্ত সেটাই আমাদের কাছে অনেক। তুই আমাদের গ্রামের গর্ব রে।
- এবারে কালীপুজো আমরা সবাই ধুমধাম করে পালন করবো। আমাদের বাড়ি, হরিদাদুর বাড়ি আলোয় ঝলমল করবে এটাই আমার ইচ্ছা। এরজন্য যত খরচ হবে আমি দেবো। তোরা থাকিস আমার সাথে। আজ যা কিছু আমি সব এই হরিদাদুর জন্য। আর একটা কথা বলি, হরিদাদুর বাড়িটা আমারই এখন কেনা। এখন যারা আছে তারা এই বাড়িটার দেখাশোনা করে। আমার একবন্ধু সব ব্যবস্থা করেছে। আজ এই বাড়িটা আমি রমাকে উপহার দিতে চাই।
ওর এই কথা শুনে সবাই হতবাক। রমা, শিবেশ এবং উমাপতি ভাবতে পারছে না। সবাই ওকে জিজ্ঞেস করল, “ব্যাপার কি?”
- আজ থাক, অনেক বেলা হয়েছে। কাল কালীপুজোর দিনে হরিদাদুর বাড়িতেই না হয় চমক দেবো সকলকে। একটু ধৈর্য ধর সকলে।
সকলে চমকের প্রতিক্ষা করে যে যার কাজে লেগে পড়লো। ইলেক্ট্রিসিয়ানকে খবর দেওয়া হল। হরিদাদুর বাড়ি সমেত সারাবাড়ি আলোয় রাঙিয়ে তোলা হল। বাড়ির ঐ বৈঠকখানায় কালী ঠাকুরও আনা হল। বেশ জমজমাটি আয়োজন করা হলো। সাগর ওর কাকাকে বলে দিয়েছিল, যতটা সম্ভব হয় পাড়ার লোকজনকে নেমন্তন্ন করে আসতে। কালীপুজোর দিন সকাল থেকেই বাড়িতে রমরমে ব্যাপার, অনেক লোকের সমাগম। সকলে মিলিতভাবে পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। সাগর ওর ড্রাইভারকে দিয়ে শহর থেকে অনেক বাজি আনিয়ে নিয়েছিল। সন্ধ্যের সময় ওদের বাড়ির আকাশ আলোকসজ্জায় ঝলমল করে উঠল। তারই মধ্যে রমা, উমাপতি আর শিবেশের মাথায় সেই চমকের ব্যাপারটা ঘোরাফেরা করছে। রমা বলেই ফেললো সাগরকে, “কিগো আমার তো তর সইছে না, কখন বলবে?”
- গিন্নী, একটু সবুর তো কর। রাত ৮টা নাগাদ আমরা হরিদাদুর বাড়ি যাবো। সেখানেই না হয় বলব।
- দূর ভাল্লাগে না।
সাগর মুচকি হেসে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সন্ধ্যে ৬টার মধ্যেই পুজোর সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে গেলো। রাত ১১টায় পুজোর সময়, সন্ধ্যে ৭টার সময় সাগর তার কাকা নারায়নবাবু, শিবেশ, উমাপতি এবং রমাকে নিয়ে হরিদাদুর বাড়ি গেলো। সেই বাড়িতে এক স্বামী-স্ত্রী থাকতো। মুলত তারাই বাড়িটার দেখাশোনা করতো। তারা সেভাবে পাড়ার কারোর সাথে মিশতো না। শুধুমাত্র সাগরের কাকার সাথে যোগাযোগ ছিল। ওদের সাথে সকলের পরিচয় করিয়ে দিলো। এরপর সাগর বলতে শুরু করলো-
- কাকা, তুমি বলবে নাকি আমি বলব। বাবা মারা যাবার পর কাকাই আমার সমস্ত কিছু দায়িত্ব নিয়েছে।
- কি যে বলিস খোকা। আমার নিজের ছেলে বা মেয়ে নেই। তোর কাকিমাও কবে ছেড়ে চলে গেছে আমাকে। তুই তো আমারই ছেলে নাকি। তোর বাবা মারা যাবার পর আমাকেই সব দায়িত্ব দিয়ে গেছে। সেই দায়িত্বতো পালন করতে হবে নাকি
- ঠিক আছে কাকা। এই বলে সাগর বলতে শুরু করল ......
হরিদাদুর দুই মেয়ে ছিল, যারা আজ এই দুনিয়ায় নেই। হরিদাদু তার বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু বিয়ের এক বছর পরেই সেই মেয়ে মারা যায়। দাদু তার ছোটমেয়ে শিখাকে বেশি ভালোবাসত। শিখা পড়াশোনা করেছিল। স্কুলের বারো ক্লাসে পড়ার সময় একটি ছেলের সাথে প্রেম হয়। দাদুকে না জানিয়েই তারা বিয়ে করে পালিয়ে যায়। দাদু ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। সেইসময় সাগরের বাবা দাদুর দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলো। সাগরের বাবা-কাকাকে দাদু নিজের ছেলের মতো করে ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসার জন্যই দাদু সাগরকে রাশিয়ায় ডাক্তারী পড়ানোর জন্য বাড়ি বিক্রি করার কথা দুবার ভাবেননি। দাদুর ছোট মেয়ে শিখা ফিরে আসেনি। সেক্ষেত্রে দাদুর সম্পত্তির উত্তরাধিকার বলতে কেউই ছিলো না। তখন দাদুর এই বাড়ি কিনে নিয়েছিলো সাগরের এক প্রিয় বন্ধু সৈকতের বড়লোক বাবা। সাগরই তাকে বলেছিল, “কাকু আপনি বাড়িটা এই মুহুর্তে কিনে নিন, আমি ফিরে এসেই বাড়িটা কিনে নেবোএবং তারপর সাগর ফিরে এসে বাড়িটা আগে কিনে নেয়। সাগরের বাবা মারা যান ওর রাশিয়ায় থাকাকালীন, শেষ বেলায় বাবার কাছে সে থাকতে পারেনি, সেই দুঃখ চিরকালীন থেকেই যাবে। সাগর কাকাকে চিঠি লিখে সবকিছু ব্যবস্থা করতে বলেছিল। সেই অনুযায়ী ওর কাকাই বাড়িতে এই দুজনকে রাখার ব্যবস্থা করে।
সাগরের কাকা নারায়নবাবু বলেন,
- হ্যাঁ বৌমা, এরা আমার চেনাজানা। এই বাড়িতে এদের দেখাশনার জন্যই রাখা হয়েছে। হরিকাকার এই বাড়িটা সাগরের বাড়ি। আমি আগলে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি মাত্র।
- কাকাবাবু, আপনিতো আমাদের অভিভাবক। এইভাবে বলবেন না। আপনি যা ভালো বুঝেছেন তাই করেছেন।
সাগর আবার বলতে শুরু করল...
হরিদাদু বাড়ি বিক্রি করার কথা যখন বলেছিলেন, তখন ওর বাবা দাদুর মেয়ে শিখাকে অনেক খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওর বাবা মারা যাওয়ার পর সেই দায়িত্ব কাকা নেয়। কাকা দাদুর ছোট মেয়েকে খুঁজে পেয়েছিলেন, কিন্তু সে আর এই পৃথিবীতে ছিলো না। শিখার বর একজন মদ্যপ ছিলো। ঠিক ভাবে দেখাশোনা করেনি। একদিন শিখাকে খুন করে তারপর জেলে চলে যায়। তাদের একমাত্র মেয়ে চলে যায় কোন এক অনাথ আশ্রমে। আশ্রমেই সেই মেয়েটি ছোট থেকে বড় হয়। অনাথ আশ্রমের গুরুমার তত্ত্বাবধানে সেই মেয়ে ভালো পড়াশোনা করে এবং পরবর্তী কালে একটি স্কুলের দিদিমনি হয়। সাগরের কাকা সব খোঁজ খবর নিয়ে সাগরকে জানিয়েছিলেন। এরপর সাগর ফিরে আসে কলকাতায়। কাকার কাছে খোঁজ-খবর নিয়ে সেই মেয়েটির কাছে যায় এবং তাকে তার গৃহিনী হওয়ার প্রস্তাব দেয়। কাকাই সবকিছু দেখাশোনা করে বিয়ে দেন। এরপর সাগর রমাকে বলে - হ্যাঁ রমা তুমিই হলে হরিদাদুর একমাত্র নাতনী। আজ তোমাকে তোমার দাদুর বাড়ি ফিরিয়ে দিলাম।
রমার চোখ দিয়ে অশ্রুরাশি ঝড়ে পড়ছে। সে বিহ্বল হয়ে পড়লো। কি বলবে সে ভেবে পাচ্ছে না। সে সাগরকে
- তুমি আমার সাথে কথা বলবে না। এতকিছু তুমি আমাকে বলোনি কেন? আমি আমার দাদুকে দেখতেও পেলাম না।

নারায়ণবাবু বলেন,
- কাঁদেনা বৌমা, তোমাকে বলার সুযোগ ছিলো নাতো। কি করে বলবো বল। আজকের এই খুশির দিনে চোখের জল ফেলতে নেই মা।
শিবেশ ও উমাপতি প্রায় একসাথে বললো,
- বৌদি, ভেবে দেখুন, আপনাকে বলে দিলে এই চমকটা হতো কি, যা হয়েছে দারুন একটা ব্যাপার হয়েছে। সাগর যে ফিরে এসে আমাদের সব্বাই কে এইভাবে চমক দেবে ভাবতে পারিনি। ও শুধু বড় ডাক্তারই নয়, খুব বড় মনের মানুষ। বৌদি, আপনি রাগ করবেন না, আজকের এই খুশির দিনে আমরা সব্বাই একসাথে আনন্দ করবো।
সাগর বলল,
- নিশ্চয়ই আনন্দ করবো। তার আগে আমি রমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। প্লিজ রমা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। একটা অনুরোধ করব তোমাকে, যদি এই বাড়িটার পাশে পুরো বাগানটায় হরিদাদুর নামে একটা হাসপাতাল করি, খুব কি খারাপ হবে। তুমি এখন মালিক, তোমার অনুমতি ছাড়া তো এগোনো যেতে পারে না। এখানকার গ্রামের মানুষের অনেক উপকার হবে, কেউ চিকিৎসার জন্য আর শহরে যাবে না।
- এইরকম বললে আমি আর কথা বলবোই না। আমি অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েছি, আমি মালিকত্ব চাই না। আমার খুব ভালো লাগছে আমি অজান্তেই শিকড়ের টানে নিজের জায়গায় চলে এসেছি। এখানকার ভালো কিছু হলে আমারও খুব ভালো লাগবে। আর শোনো ডাক্তারবাবু, শুধু হাসপাতাল করাই নয়, প্রতি সপ্তাহের একটা দিন তুমি এই গ্রামের মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা করবে, কথা দাও। তোমার সাথে আমিও আসব।
- সে আর বলতে
সবাই সাগর আর রমার কথায় হো হো করে হেসে ফেললো। এরপর তারা ফিরে গেলো নিজেদের বাড়িতে, এবং কালীপুজোর তোরজোড় আরম্ভ করে দিলো। রাত ১১টায় যাথারীতি ব্রাহ্মণ মশাই এসে পুজো আরম্ভ করলেন। সাগর আর রমা দুজনেই অঙ্গীকারবদ্ধ হল আগামী দিনগুলোয় হরিদাদুর স্মৃতিগুলো তাদের কাজের মাধ্যমে যেন আরো বিকশিত হয়ে ওঠে।

প্রকাশিত (মুদ্রিত)
- আমাদের লেখা পত্রিকা, ২০১৯

ছবিঃ রেওয়া পত্রিকার, বিপন্ন শৈশব সংখ্যার প্রচ্ছদ থেকে আংশিক নেওয়া 


Saturday, August 13, 2022

কোলাহল মুক্ত জিরো পয়েন্ট

 

~ রাজকুমার ঘোষ 


শহরের কোলাহলে জটিল জীবন কয়েক মণ ভার নিয়ে মানুষের জীবন দিশাহারা করে দিচ্ছে দিনের পর দিন। সেখান থেকে বেরোতে পারা সম্ভব তো নয়ই, বরং বরং দিন দিন এই ভার জেঁকে বসেছে। তবুও ইচ্ছা হয় সেই ভার থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে। সেই কারণেই বাঙালি মন চায় কোলাহল মুক্ত জীবন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। মাঝেই মাঝেই পাহাড়ের দিকে মন টানে। আর পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার মজাই আলাদা রকমের, সেটা যদি আবার সিকিমের মত পাহাড়ি রাজ্য হয়। ভাবা যায় গোটা রাজ্যটাই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত, যার রাজধানী গ্যাংটক হল তার মধ্যমণী । বেশ কয়েক বছর আগে আমরা দার্জিলিং-এ যাব বলে বেড়িয়েছিলাম, কিন্তু রাজনেতিক অস্থিরতার দরূণ আমরা সিকিমে চলে এসেছিলাম। তখন আমরা ছাঙ্গু, বাবাধাম, ইয়ুমথাংগ পর্যন্ত্যই আটকে গিয়েছিলাম, কিন্তু লোক মুখে শোনা জিরো পয়েন্টকে না দেখেই ফিরে আসতে হয়েছিলো। কাছে এসেও দেখতে না পেয়ে ভীষণ আক্ষেপ হয়েছিলো । মনের সেই ইচ্ছাটা ভাগ্যিস ধরে রেখেছিলাম । তাই গতবছর পূজোর পর টার্গেট করেই রেখেছিলাম যে আবার আমরা গ্যাংটক যাব, মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই জিরো পয়েন্ট ।   

          ইচ্ছা অনুযায়ী লক্ষী পুজোর ঠিক পরের দিনই আমরা দল বেধেঁ গ্যাংটক থুরি জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম । প্রায় ৮ জন নিয়ে আমাদের দল বেশ ভারী ছিলো । স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সবাই খোশমেজাজে। আমার হিরো মানে আমার ছেলে ঋষভ তো বেজায় খুশি। তার কাছে এই ঘুরতে যাওয়া এক বিরাট অনুভব, সে আমার কাছে সিকিম তথা গ্যাংটক এমনকি জিরো পয়েন্ট নিয়েও জেনে নিয়েছে ।

শিয়ালদাহ থেকে রাতের কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস ধরে আমরা সবাই গ্যাংটক পৌছে গেলাম পরের দিন সকালে, তারপর সেখান থেকে ট্রাভেলের গাড়িতে চেপে পাহাড়ী রাস্তার অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা বিকালে গ্যাংটক পৌঁছে গেলাম। সেদিনের মত বিশ্রাম নিয়ে তার পরের দিন থেকেই আমাদের চোখ থাকার স্বার্থকতাটা বুঝতে পারলাম। পরের দিন ছাঙ্গু ও বাবাধাম, তার পরের দিন পশ্চিম সিকিমের সান্ড্রাপ্সি, সাই বাবার মন্দির ও চারধাম দেখে আমরা সবাই অভিভূত। আমাদের খুব ইচ্ছা ছিলো যে ছাঙ্গু ও বাবাধামের বরফ পড়া দেখবো, কিন্তু বেশ হতাশ হয়েছিলাম। সেভাবে কিছুই দেখতে পেলাম না। যেদিন গিয়েছিলাম ঠিক তার পরের দিনই নাকি বরফ পড়েছে। হতাশ যেন আরো বেড়ে গেলো। বৃষ্টি পড়ায় নাকি ওখানে বরফ পড়েছে। তা আমরা গ্যাংটকের যে হোটেলে ছিলাম, সেখানকার ম্যানেজার বললো জিরো পয়েন্টে বরফ নাকি পাবোই, শুনে বেশ আনন্দ পেলাম। সেইভাবে ম্যানেজারই ব্যবস্থা করে দিলো। মাথা পিছু ২৫০০ টাকা প্যাকেজে আমাদের উত্তর সিকিমে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো। সে দায়িত্ব নিয়ে আমাদের তার পরের দিন বেলা ১১টায় গাড়িতে তুলে দিলো। গ্যাংটক থেকে আমরা উত্তর সিকিমের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। এরপর আমরা যত এগোচ্ছি উত্তর সিকিমের দিকে ততই মনে শিহরণ জাগছিল, বিশেষ করে ঋষভের। হয়তো এর আগে আমরা এই রাস্তা দিয়ে ইয়ুংথাংগ গিয়েছি, কিন্তু কলকাতার কোলাহল মিশ্রিত মন এবং অবশ্যই দূষণ যুক্ত দৃষ্টি বারে বারে এই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। গোটা ব্যাপারটাই যেন কোলাহল মুক্ত। শুধু চোখ আর মনের অপার শান্তি। দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম মঙ্গনে। তার আগে অবশ্য আমরা ড্রাইভারের ঠিক করা একটি হোটেলে লাঞ্চটা সেড়ে ফেলেছিলাম। এরপর আমরা যাবার পথে ‘সেভেন সিস্টার’ জলপ্রপাত দেখলাম। ভয়ংকর সুন্দর এই জলপ্রপাতটি দেখে সকলে মোহিত হয়ে গেলাম। এই ফলসের কাছে গিয়ে আমরা যে যার মতো সুপার পোস দিয়ে ছবি তুলে নিলাম, আমিও এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে উপভোগ করে ছেলে ও ওয়াইফকে নিয়ে ক্যামেরা বন্দী করে নিলাম ।


বিকাল ঘনিয়ে সন্ধ্যে হয়ে এলো অথচ আমাদের গন্তব্য লাচুং তখনও অনেক দূরে । এর আগে যখন এসেছিলাম আমরা প্রায় সন্ধ্যের মুখে লাচুং এ পৌছে গিয়েছিলাম । কিন্তু এবার রাস্তা ভীষন খারাপ থাকায় এত সময় লাগলো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে জানালো লাচুং পৌছতে রাত ৮টা বেজে যাবে। উত্তর সিকিমে চুংথাং নামে একটি টাউন ছিলো। গ্যাংটক থেকে ৯৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর সিকিমের একটি জনপ্রিয় টাউন, যেখানে ইন্ডিয়াম আর্মির বেস ক্যাম্প আছে, আর বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আছে। সন্ধ্যে হওয়ার দরুন আমরা এই চুংথাং টাউন টিকে সেইভাবে দেখতে পেলাম না। উত্তর সিকিমের আরেকটি জনপ্রিয় টাউন মঙ্গনও খুব সুন্দর। এই পাহাড়ি টাউনটির চারিদিকে বিশাল জনবসতি ও দোকানপাটে ঘেরা। গতবারে এসে ছোট অথচ জনপ্রিয় এই টাউনটি দেখে দারুন আনন্দ পেয়েছিলাম। ভাবতে পারেনি যে এই দূর্গম পাহাড়ের মাঝে এত সুন্দর একটি টাউন থাকতে পারে। কিন্তু এবারে গিয়ে এই মঙ্গন-এর রুপ দেখে একেবারে মন খারাপ হয়ে গেল।  ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ এ এক বিদ্ধস্ত ভুমিকম্পে মঙ্গন পুরোপুরি ভাবে এলোমেলো। এখানে রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। সিকিম সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে উত্তর সিকিমকে আরো সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলার। এবং তাদের চেষ্টাও অনস্বীকার্য। দেখলাম তারা আবার মঙ্গনকে সাজিয়ে তুলছে আগের মতই। প্রায় ৬.৯ ম্যাগ্নিচুডে জোরালো ভুমিকম্পে মঙ্গন সহ উত্তর সিকিমের অন্যান্য জায়গায় যে প্রভাব পড়েছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমরা প্রায় ৭টার সময় চুংথাং এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই টের পাচ্ছিলাম যে এই পথ কত দূর্গম ! যাই হোক ঠিক রাত ৮ টার খানিক আগে ড্রাইভার লাচুংয়ে আমাদের একটি হোটেলের সামনে গাড়ি নিয়ে চলে এলো। বুঝে গেলাম আজকের রাতে আমাদের এইখানেই থাকতে হবে। রাত ১০ টা নাগাদ আমাদের ডিম-ভাত-সব্জি দিয়ে ডিনার খাওয়াতে বুঝে গেলাম গ্যাংটকের হোটেলের ম্যানেজার আমাদের কতখানি চুনা দিয়েছে । হোটেলের অবস্থা মোটামুটি মন্দের ভালো। ড্রাইভার সকলকে বলে গেলো ভোর ৬ টার সময় উঠতে হবে, সে আমাদের ইয়ুংথাম এ নিয়ে যাবে, তারপর মর্জি হলে জিরো পয়েন্ট । আসলে গ্যাংটকের ঐ হতচ্ছাড়া ম্যানেজারের প্যাকেজ এ জিরো পয়েন্ট ছিলো না ।

                ভোর ৬টার সময় আমরা ঘুম থেকে উঠে যে যার মত করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। ঋষভও দেখলাম বেশ উৎসাহ নিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। প্রায় ৪০ মিনিট পর আমরা ইয়ুংথাম চলে এলাম।  সেখানে গতবারে এসে আমরা দারুন মজা করেছিলাম, তাই এবারে এসে অতটা আগ্রহ দেখালাম না। আমাদের চোখ যে জিরো পয়েন্ট। ড্রাইভারকে বললাম আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি জিরো পয়েন্ট এ যেতে চাই। ওর সাথে মাথা পিছু ২০০০ টাকার রফা করে আমরা এগিয়ে চললাম জিরো পয়েন্টের দিকে। আমাদের চোখ সার্থক হবেই এই মনোভাবে একরাশ আনন্দ ও প্রত্যাশা নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম কাঙ্খিত জিরো পয়েন্টের দিকে। যেতে যেতে কত সুন্দর দৃশ্য আমাদের নজরে এলো যে অভিভূত শব্দও বুঝি তাতে কম হয়। গাড়ি থেকেই আমি অনেক দৃশ্য আমার মোবাইলের ক্যামেরায় নিয়ে নিলাম। আরো ৪০ মিনিট পর আমরা পৌছে গেলাম জিরো পয়েন্ট এ। গাড়ি থেকে নেমেই আমি প্রনাম জানালাম এই অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে। যে দিকে তাকাই শুধু সাদা চাদরে মোড়া বরফের সমাহার। ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করবো, কোথা থেকে শুরু করবো এই অনন্য সুন্দর শোভাকে নিজের মত করে উপভোগ করার, বেশ দ্বন্ধে পড়ে গেলাম। যেদিকে চাই, সেদিক টাকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। অনেক ছবি তুললাম মনের মত করে, তবুও যেন কম হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১০০র বেশি ছবি তুললাম, সেটাও যেন খুব নগণ্য। আমার ছেলে ঋষভ বরফ নিয়ে খেলা করতে লাগলো, ওর মাও ওর সাথে যোগ দিলো। ওরা ওদের মত করে এই সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করতে লাগল। তার ওপর সূর্যমামা আজ বড়ই প্রসন্ন, তার ছটা উঁচু হয়ে থাকা বরফে আবৃত শৃঙ্গ গুলোকে আর আলোকিত করে তুলেছিলো। সেই আলোর ছটায় আমরা আরও উদ্ভাসিত। আমি সেই মনোরম শোভাকে ক্যামেরা বন্দী করতে ভুল করলাম না। 


আমরা সবাই বিভিন্ন রকম পোস দিয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। আমি নিজেকে হিরো ভেবে পোস দিলাম আর আমার স্ত্রীকে বললাম ফটো তুলতে। তার ওপর বেশ কনকনে ঠান্ডা, আমি শুধু সোয়েটার পড়ে শাহরুখ খান স্টাইলে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। প্রায় দু'ঘন্টা আমরা সবাই বেশ মজা করলাম। ২ ঘণ্টা কাটিয়ে আমাদের মনে হলো যে সমস্ত পয়সা উসুল, আমাদের এখানে আসা সার্থক । গ্যাংটকের হোটেলের সেই বদ ম্যানেজারকে আর গালাগাল দিতে ইচ্ছা করলো না। কারণ আমাদের চোখে শুধু জিরো পয়েন্টের বিষ্ময়, শুধু তার শোভাই বিরাজ করছে চোখে ও মনে। ফেরার পথে আরো অনেক ছবি তুলে আমরা লাচুং-এ ফিরে এলাম। আবার সেই ডিম-ভাত-সব্জি দিয়ে লাঞ্চ করে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে ফিরে যাওয়ার পথ ধরলাম। ঐ পথ ধরে যখন ফিরছিলাম, ভয়ানক দূর্গম রাস্তা দেখে আমরা হতবাক। অথচ ড্রাইভার গতকাল রাতেই ঐ রাস্তা দিয়েই নিয়ে এসেছে। মনে মনে ড্রাইভারকে বাহবা দিলাম। চুংথাং টাউন দিয়ে যাবার সময় একটা মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলকে বেশ ব্যাথিত করে তুলল। জানতে পারলাম একটা মিলিটারি গাড়ি নাকি খাদে পড়ে গেছে। ঐ গাড়িতে ইন্ডিয়ান আর্মির প্রায় ১৬ জন জওয়ান ছিলো। ড্রাইভারই আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে খবর নিয়ে আমাদেরকে  জানালো। মঙ্গন হয়ে ফেরার সময় আবার ‘সেভেন সিস্টার’ ফলস দেখে ফেললাম। বিকাল হয়ে সন্ধ্যে চলে এলো। আমাদের গাড়ি গ্যাংটকের দিকে ছুটে চলেছে। গাড়িতে আমাদের সবাই ঘুমে কাতর। আমার চোখ দুটো একটু বুজতে চাইলো, কিন্তু জিরো পয়েন্টের সমস্ত সোন্দর্য্য সেটা হতে দিলো না। ক্লান্ত চোখেও আমি নিখাদ কোলাহল মুক্ত জিরো পয়েন্টের কথা ভেবে আমার মোবাইলের নোটপ্যাডে একটু কবি হওয়ার চেষ্টা করলাম ……… 

বরফের চাদর

কি অপূর্ব শোভা, তার কি মহিমা !!

সার্থক, আজ আমি করি তার বন্দনা … 

বরফের চাদরে মোড়া, হে অপরূপা

জিরো পয়েন্ট, সৃষ্টির অনন্য এক শিরোপা !

Thursday, August 11, 2022

অচেনা শহর পাটনা


রাজকুমার ঘোষ 

# ১১-০৮-২০২২ 

জীবনের পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আজ রাখি পূর্ণিমার দিনে রাজীববাবু বাড়ির বারান্দায় বসে পঁয়ত্রিশ বছর আগের একটি সুখস্মৃতি ভাবছে, যা তাঁর মণিকোঠায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। তখন কাজের সূত্রে প্রথমবার তিনি পাটনা গেছেন। অচেনা শহর, কাউকেই চেনেন না। পাটনার সাউথ গান্ধী ময়দানের কাছে একটি হোটেলে ছিলেন। সেখান থেকে ভীষণ কাছেই একটি সংস্থার অফিসে ওনার কাছ ছিল। সেই অফিসের মেন বস আহমেদ আলীর সাথে রাজীব বাবুর পরিচয় হয়। প্রায় সপ্তাহখানেক পাটনায় থাকতে হবে এবং কাজগুলো সম্পূর্ণ করে তবেই বাড়ি ফিরতে পারবেন। যথেষ্ট চাপের কাজ। এছাড়া পাটনা শহর হিসাবে অশান্ত৷ রাজীব বাবুর কাছে পাটনা নাম শোনা মাত্রই ভীষণ অস্বস্তি। তবুও কাজের জন্যে আসতেই হল।  সেই সময় যখন তখন পাটনার রাস্তাঘাটে হত্যালীলা চলত, তার খবর নিউজ পেপারে হামেশাই প্রকাশিত হত। এমন একটি অশান্ত শহর পাটনায় রাজীব বাবুর দু'দিন কাটাতেই যেন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তার ওপর এক সপ্তাহ থাকতে হবে। কাজের ক্ষেত্র একজায়গায় নয়। বিভিন্ন শাখা অফিস যেমন, রাঁচি, হাতিয়া, মুজফফরপুর, হাজিপুর, মুঙ্গের, বেগুসরাই, নামকুম, টাটা প্রভৃতি জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হবে। সাথী হিসাবে থাকবেন আহমেদ আলী বা কখনো কখনো আহমেদ আলীর এক ঘনিষ্ট বন্ধু ঈদ্রিশ আলী। এই ঈদ্রিশ আলীর নিজস্ব একটি ব্যাটারী সেন্টার আছে। বেশ বড় বিজনেসম্যান। তারচেয়েও বড় কথা, ঈদ্রশ আলী এক বড়ধরণের গুণ্ডা। তার সাথে অনেক নেতা-পুলিশের চেনা জানা। কাউকে খুন করে লাশ গুম করে দেওয়া ঈদ্রিশের বাঁ হাতের খেল। ঈদ্রিশের এই ব্যাপারটা ওর সাথে প্রথম দর্শন বা ওপর ওপর মেলামেশা করলে কেউ বুঝতে পারবে না। রাজীব বাবু এমনিতে বেশ খোলামেলা এবং বন্ধু বৎসল। সকলের সাথে খুব সহজেই মিশে যান। প্রায় সপ্তাহ খানেক আহমেদ ও ঈদ্রিশের সাথে বিভিন্ন জায়গায় একসাথে ঘোরা, কাজ করা এবং অবশ্যই রাজীববাবুর ব্যবহারে ওরা দুই আলী ভীষণ মুগ্ধ। মাত্র কদিনেই রাজীববাবুকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো, প্রতিদিনের কাজের পরে টুকটাক আড্ডা, গল্প গুজবে সময় কাটানো সবই হয়েছে। ক'দিনেই এই অচেনা পাটনাতে রাজীববাবুর দু'জন বন্ধু জুটে গিয়েছিল। একদিন একটি বাঙালী হোটেলে লাঞ্চের সময় কথোপকথনে রাজীব বাবু জানতে পারলেন ঈদ্রিশের আসল পরিচয়,

হোটেলে রাজীব বাবু তিনটে মাছ-ভাত এর অর্ডার দিয়েছিলেন,

- দেখিয়ে আহমেদ ভাই, ঈদ্রিশ ভাই, আজ বাঙালী হোটেল মে বাঙালী খানা, মছলি-ভাত মেরে সাথ লাঞ্চ কর লিজিয়ে।

- আরে দাদা, হামলোগ কো আচ্ছা লাগতে হেয় ইয়ে মছলি ভাত। হামরা ভালো বাঙলা জানি রাজীবদা। বাঙলা ভাষা মিঠা আছে। আর বাঙালিদের সাথেই আমাদের কোম্পানির কাজ বেশি করতে হয়। এই কোম্পানির মালিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেকেই বাঙালি।

- বাহ শুনে খুব ভালো লাগল। আহমেদ ভাই। কদিনে আপনাদের সাথে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এবার পাটনা এলেই আপনাদের সাথে যোগাযোগ করব।

- একদম দাদা।

সেইসময় একজন ষণ্ডামার্কা লোক, ঈদ্রিশের কাছে এলো। কানে কানে কি যেন বলল, তারপর ঈদ্রিশ অর্ধেক খাওয়া ভাত-মাছ রেখে সেই লোকটার সাথে চলে যাওয়ার আগে রাজীববাবুকে বলল,

- দাদা প্লিজ। ডোন্ট মাইন্ড। একটো কাজ এসে গেছে, তুরন্ত যেতে হবে। ফির কভি।

অগত্যা রাজীব বাবু মেনে নিলেন। আহমেদ আলীর সাথে বসে লাঞ্চটা সেড়ে নিলেন। লাঞ্চ করতে করতেই আহমেদ আলী রাজীববাবুকে জানাল ঈদ্রিশের সম্বন্ধে। এখানকার নেতা-মন্ত্রী, পুলিশ কর্তাদের সাথে ঈদ্রিশের দারুণ কানেকশন। আহমেদ আলী জানায়, এই ঈদ্রিশের জন্যই সে পাটনায় আছে। ওর বাড়ি দেওঘরে। পাটনায় দারুণ ভাবে সেটল হয়ে থাকার জন্য একমাত্র ঈদ্রিশের অবদান। ঈদ্রিশ যেমন পরোপকারী, তেমনি বিপজ্জনক। ভালো মানুষের জন্য খুবই ভালো, খারাপ মানুষের জন্য খুবই খারাপ। এসব শুনে রাজীব বাবুর চক্ষু চড়কগাছ। আহমেদ আলী সেটা বুঝতে পেরে বলে,

- আরে রাজীবদা, আপনি ডরবেন না। আপনি ভীষণ ভালো মানুষ, মাই ডিয়ার লোক আছেন। ঈদ্রিশ আপনাকে খুব রেসপেক্ট করে।

পাঁচদিনের মাথায় রাজীববাবু রাঁচিতে কাজ করতে গেলেন। দুদিন ওখানে কাজ সেরে রাজীববাবু রাঁচি থেকে রাত ৮টার বাস ধরে পাটনায় ফিরে এলেন। বাস থেকে নামলেন রাত ১২টা ১০ মিনিটে। পাটনার সাউথ গান্ধী ময়দান সংলগ্ন সমস্ত রাস্তা শুনশান। অল্প রাস্তা পায়ে হেঁটে মাত্র ৩ মিনিট। ফাঁকা রাস্তা ধরে রাজীব বাবু পূর্ব পরিচিত হোটেলে ফিরে এলেন বটে, কিন্তু এই তিন মিনিটের মধ্যেই যেন ঘেমে অস্থির। হোটেলের রিসেপশনে যিনি ছিলেন,

- রাজীব স্যার আইয়ে আইয়ে ...

- হ্যাঁ, বহুত লেট হো গ্যায়া। রাত মে ইয়ে সাউথ গান্ধী ময়দান শুনশান। ডর গ্যায়া বহুত। প্লিজ রুম কি চাবি দি জিয়ে ভাই।

- জরুর। কুচ খানা আপকে লিয়ে...

- হুম ভুক তো লাগ রাহা হে। মেরে লিয়ে তিন রুটি, সবজি অর এক আণ্ডা ফ্রাই। কুছ রুপিয়া রাখ লিজিয়ে।

রাজীব বাবু প্যান্টের পেছন পকেটে হাত দিতে গিয়েই দেখে যে মানি ব্যাগ নেই। এই মানি ব্যাগেই তার সমস্ত টাকা ছিল। ভীষণ হতাশ হয়ে পড়লেন।

- ভাইয়া, বহুত বুড়া হুয়া মেরে সাথ। মেরা পার্স কোই উঠা লিয়া পকেট সে। সব রুপিয়া উসি মে থা। মেরা সমজমে কুছ নেহি আরা হে। ক্যায়া করু

- আপ শান্ত হো যাইয়ে পেহেলে। ঠান্ডে দিমাগ রাখিয়ে প্লিজ। পেহেলে আপ রুমে মে যাইয়ে। ম্যায় আপকে লিয়ে খানা ভেজতা হু।

- ঠিক হ্যায়। বহুত ট্যায়ার্ড হু। কাল শুভা কুছ করতা হু।

সেদিন কোনোরকমে কিছু মুখে দিয়ে রাজীব বাবু একরাশ মন খারাপ নিয়ে হোটেলের ঘরে ঘুমিয়ে গেলেন। উঠে পড়লেন খুব সকাল সকাল। উঠেই ছুটলেন আহমেদ আলীর সাথে দেখা করতে।

- আহমেদ ভাই, আমার সব টাকা পকেটমারী হয়ে গেছে।

- কি বলেন দাদা। এতো রুপিয়া পকেটে লিয়ে ঘুমবার কি দরকার ছিল। কুছ রুপিয়া আলাগ সে রাখতে পারতেন তো।

- জীবনে এই প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতা হল। কি করে জানবো, আমার সাথেই এমন হবে। আমি বাড়ি যেতে পারবো না, আপনারা সাহায্য না করলে। আর আমাকে আজই রাতের ট্রেন ধরতে হবে। কাল রাখী পূর্ণিমা আছে। বোন অপেক্ষা করবে। আমাকে রাখী না পরিয়ে সে কিন্তু খাবেই না। কি যে করি, মাথায় কিছু আসছে না আহমেদ ভাই।

- এতো তকলিফ নেবেন না দাদা ... প্লিজ। ঈদ্রিশ থাকতে আপনার চিন্তা কিসের...

একজনকে দিয়ে ঈদ্রিশের কাছে খবর পাঠাল আহমেদ। প্রায় দশ মিনিট পর ঈদ্রিশ হন্তদন্ত হয়ে চলে এল। এসেই রাজীববাবুকে জিজ্ঞেস করলেন,

- শুনলাম দাদা, আপ তকলিফ মে ...

- আরে দাদার পিক পকেট হো গ্যায়া। সব রুপিয়া গায়েব। - আহমেদ জানাল।

- হ্যাঁ ঈদ্রিশ ভাই, কাল রাঁচি থেকে পাটনায় ফেরার পথে আমার পকেট থেকে মানি ব্যাগ গুম হয়ে গেছে। আমার কাছে একরুপিয়াও নেই। আজ রাতে বাড়ি ফিরতেই হবে। কাল রাখী পূর্ণিমা মানে রক্ষা বন্ধন আছে। বোন অপেক্ষা করবে। ফেরার টিকিট মানি ব্যাগেই ছিল। কি হবে?

- আরে দাদা, এই ঈদ্রিশ ভাই আছে যখন, একদম টেনশন নেবেন না। আমার ভালো লাগবে আপনার মত ভালো মানুষের কাজে লাগতে পারলে। একদম টেনশন নেবেন না। পেহেলে আপনার জন্য টিকিট যোগাড় করি চলুন।

এই বলেই ঈদ্রিশ রাজীববাবুকে সাথে নিয়ে চললেন টিকিট বুকিং কাউন্টারে। সেখানে যে টিকিট কাটছিল সে জানাল, রিজার্ভেশন নেই, হবে না। ঈদ্রিশ আলী এরপর তার কানে কানে কি একটা বলল, তার কিছুক্ষণ পরেই লোকটা রাজীববাবুর থেকে ডিটেলস নিল, এবং একটা রিজার্ভেশন টিকিট রাজীববাবুর হাতে ধরিয়ে দিল। রাজীব বাবু কার্যত অবাক। এরপর সেখান থেকে রাজীববাবুকে নিয়ে ঈদ্রিশ আলী ফিরে এল হোটেলে। এসে হোটেলের সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিল। এরপর রাজীববাবুর হাতে বেশ কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

- আমি রাতে এসে আপনাকে স্টেশনে পৌঁছে দেব। আপনি রেডি থাকবেন।

- ঈদ্রিশ ভাই, থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনার এই উপকার একদম ভুলবো না। কিন্তু আপনার টাকা কিভাবে দেবো ...

- বোহিনের কাছে ভাইকে পাঠানোর দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন টাকার কথা না ভেবেই নিয়েছি দাদা। আমার বোন ছিল, সে এখন নেই। সে অনেক কথা। বলে আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না। পরে যখন সুযোগ হবে নিশ্চই জানাবো। আপনি সাবধানে বাড়ি ফিরে যান এটাই আমার চাওয়া।

- অবশ্যই কলকাতা আসবেন ঈদ্রিশ ভাই। খুব ভালো লাগল আপনাদের সাথে পেয়ে। আগামীদিনে হয়তো দেখা নাও হতে পারে, কিন্তু আমার বন্ধুর তালিকায় আপনি সারাজীবন থেকে গেলেন। আর রক্ষা বন্ধনের ভালোবাসা নেবেন আমার ও বোনের তরফ থেকে।

সেদিন কথা মতো ঈদ্রিশ ভাই রাজীব বাবুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। রাখী পূর্ণিমার দিনে সকালে বাড়িতে পৌঁছেই রাজীববাবু বাড়ির সবাইকে জানালেন সমস্ত ঘটনা। বোনকে বললেন, সেই মানুষটার কথা ভাব, তার উদ্দেশ্যেও একটা রাখী নিয়ে ভগবানের হাতে পড়িয়ে দিস বোন। শুধুমাত্র তার জন্যই আজ তোর দাদাকে তুই কাছে পেলি।

আজ পঁয়ত্রিশ বছর পরেও ট্রেন ছাড়বার মুহূর্তে ঈদ্রিশ আলীর সেই চোখ ছল ছল মুখ রাজীব বাবুর এখনও মনে আছে। না এরপর ঈদ্রিশ ভাই এর সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি রাজীববাবুর। তবে রাজীববাবু দায়িত্ব সহকারে ঈদ্রিশের ঠিকানায় একটি ব্যাঙ্ক ড্রাফট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মনে মনে রাজীব বাবু বললেন, "সেদিনের সেই অচেনা পাটনা শহরের পরিত্রাতা তুমি, ঈদ্রিশ ভাই। তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থাকো।"

Monday, August 1, 2022

স্বর্গরাজ্যে ফেলুদা


রাজকুমার ঘোষ 

ফেলু মিত্তিরের কেমন একটা যেন মনে হলো। বেশ একটা ঘুমের ঘোরে ছিলেন। হঠাৎ করেই ভেঙে গেলো। কিন্তু চোখের সামনে এতো মেঘ, মানে এই মেঘ যে সে মেঘ নয়। সোনার মেঘ। তাঁর সারা শরীর জুড়ে মেঘের কেমন একটা মায়া মায়া স্পর্শ। বেশ একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি মনে হচ্ছে তাঁর। আশে পাশে কেউ নজরে এলো না। ফেলুদা এগিয়ে চললেন। কোনো দিক নির্দেশ নেই, মনে হচ্ছে তাঁর পা তাকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার মন তাকে বাধাও দিচ্ছে না। সবই কেমন যেন একটা ভালো লাগার ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই কি একটা কোলাহলের শব্দ শুনতে পেলেন ফেলুদা। খুব খুব চেনা চেনা কন্ঠস্বর। দীর্ঘদিন পর আর একটি পরিচিত গলা ফেলুদার নাম করে ডাকছে।    

"ও মশাই, ও মশাই ... আরে এদিকে আসুন, এদিকে..." ফেলুদা এই গলার আওয়াজে বেশ বিভ্রান্ত হয়ে গেলো। এতো তাঁরই সফর সঙ্গী তথা রহস্যভেদের সঙ্গী লালমোহনবাবু। অনেকদিন পর গলাটা শুনে কি ভালো লাগছে ফেলুদার। ফেলুদা গলাটা শুনেই চলে এলেন সেখানে - তারপর                       
জটায়ুঃ হুররে, স্বর্গরাজ্য অপরাধমুক্ত করার আসল মানুষ এসে গেছেন৷
ফেলুদাঃ কি বলছেন লালমোহনবাবু ? এখানেও অপরাধ ! বলেন কি...
জটায়ুঃ হাইলি সাসপিসিয়াস (মগনলালের উদ্দেশ্যে)... ব্যাপারটা ভালো মনে হচ্ছে না ।
ফেলুদাঃ কেন কি হলো আবার ?
কিছুদূরে মগনলাল বসে ছিলেন। কিছুটা আন্দাজ করলেন -
মগনলালঃ আর বলেন না ফেলু মিত্তির৷ বেনারসে সেই যে ঘটনা হয়েছিল, সেই ট্রমা থেকে এখনো বেরোতে পারেননি আঙ্কেল। যাই হোক, ওয়েলকাম, ফেলু মিত্তির। মর্ত্যে আমার অনেক সাগরেদ ছিল, আপনি তাই শত্রু ছিলেন৷ কিন্তু এখানে আপনি আমার বন্ধু আছেন। আর এখানে ক্রাইম করার জায়গা নেই। ইন্দ্রদেব একাই সেই দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন। আর এখানে কেউ দোস্ত হতে চাইছে না আমার সাথে। একা একা হয়ে যাচ্ছি। আশা করি, এবার থেকে আর বোর হবোনা সিওর।
জটায়ুঃ ওর একটা কথাও বিশ্বাস করবেন না। দেখেছিলেন তো, আমার কি অবস্থা করেছিল। ওকে দেখলেই আমার কেমন মাথা ভন ভন করে ঘুরতে থাকে।
মগনলালঃ ছাড়েন ছাড়েন ওর কথা। আসুন এখানে একটু দাবার চাল হয়ে যাক। ও আঙ্কেল ভিতুর ডিম আছে। কতবার বললাম, আসুন একটু দাবার চাল শিখিয়ে দিই। কে শোনে কার কথা। আমাকে এখনও ভিলেন ভাবে।
জটায়ুঃ ভিলেন শুধু, ভেরি সাসপিসিয়াস। চোখ খানা দেখছেন, ফেলুবাবু। কেমন লাল আর ভয়ংকর।
ফেলুদাঃ আরে আমি আছি তো লালমোহনবাবু।
জটায়ুঃ একদমই তাই। আপনি এসে পড়েছেন আমার আর চিন্তা নেই। এতদিন যে কিভাবে ছিলাম আমি। এখানে সবকিছু শান্ত, নতুন কোনো প্লটও আসছে না। ভাবলাম 'স্বর্গরাজ্যে হানাদার' নামে একটা দুর্দান্ত ক্রাইম থ্রিলার লিখব। প্রখর রুদ্র তার শক্তি আর বুদ্ধির জোরে সব কিছু সমাধান করে দেবে। কিন্তু এখানে তো সবই সুন্দর। আপনিও নেই। সবাই কি ভালো। এই মগনলাল এসেই আমার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
মগনলালঃ হা হা হা হা ... ডরপুক আঙ্কেল। ভাগো ইয়াসে। আসুন ফেলুবাবু, হয়ে যাক তবে, একটু দাবা খেলি।
ফেলুদাঃ নিশ্চয়ই৷ তবে তার আগে আমার আসল তিন বন্ধুর সাথে একটু দেখা করি। আমি ওদের শ্যাম যে। কতদিন যে বসন্ত বিলাপের সামনে আড্ডা দিইনি। হ্যাঁ ওদের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। আমার তিন প্রিয় বন্ধু - নাটা করে গুপ্ত (ফেলুদা ডেকে নিলো, সাথে আরও দুজনকে)। প্যাংলা চেহারার সিধু আর লালু।   
গুপ্তঃ এইতো আমাদের পেছনে তুইও এসেছিস শ্যাম। হুররে। আজ আমরা মই নিয়ে তৈরী হচ্ছিলাম, এখানে অপ্সরাদের গেস্ট হাউসে হানা দেবো। তোকেও পেয়ে গেলাম। অপ্সরাদের নাচের বারোটা বাজাবো৷ জানিস, আমাদের হ্যাটা করেছে। আমাকে আর সিধুকে বলেছে কিনা 'লরেল হার্ডি' ।   
সিধুঃ দেড় বছর হলো আমি এখানে এসেছি শ্যাম। এখানে থেকে কেমন দেখতে হয়েছে রে আমাকে।
লালুঃ আহা! উত্তমকুমারের মত, একটা অপ্সরাও যদি তোর এই প্যাকাটির মত চেহারার দিকে তাকাতো। 😆😆
সিধুঃ ঠিক হবে না বলছি লালু। তোকে ধরে কেটে ফেলবো। 😡😡 জানিস শ্যাম, আমি এখানে একটা অপ্সরাকে পটিয়েও ফেলেছিলাম, মাঝখান থেকে এই লালু সব গুবলেট করে দিলো।
ফেলুদা চলে এলেন শ্যামের আদলে ...
শ্যামঃ আচ্ছা ঠিক আছে। ঠিক আছে। তোরা সেই এক রয়ে গেলি। চেঞ্জ আর হলি না।
লালুঃ তোর সাথে এরা কে শ্যাম? সামনে এই টাকলাটা আর ওখানে বাবুর মতো বসে থাকা মালটা?
শ্যামঃ চুপ কর। ইনি (জটায়ুকে দেখিয়ে) লালমোহনবাবু।
জটায়ুঃ (ফেলুদাকে থামিয়ে, গদ্গদ হয়ে) আমি হলাম জটায়ু, লালমোহন গাঙ্গুলি। আমার অনেকগুলো বিখ্যাত রহস্য উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। প্রখর রুদ্রের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই।
গুপ্তঃ কি ক্ষুদ্র?
জটায়ুঃ (ঘাবড়ে গিয়ে) কি বলছেন? আপনি প্রখর রুদ্রের নাম শোনেননি?
গুপ্তঃ দূর মশাই, শুনেছি শুনেছি। আমিও তো লিখেছিলাম প্রখর রুদ্রকে নিয়ে।
লালুঃ উপস্থিত। আমিও আছি। আমিও লিখেছি প্রখর রুদ্রকে নিয়ে। আর লিখতে লিখতে আমরা টপকে গেছি, আর এখানে চলে এসেছি।
জটায়ুঃ কিরকম কথা হলো, ফেলুবাবু এরা কি বলছে?
মগনলালঃ কি আঙ্কেল, আবার ভয় পেলেন মনে হচ্ছে। আরে ওই প্যাংলা বাদে বাকি দুজন মর্ত্যে আপনার ভূমিকায় ছিলো কিছুদিন। কি ঠিক বললাম তো ফেলু মিত্তির।
শ্যামরুপি ফেলুদাঃ ঠিকই বলেছেন মগনলালজী। লালমোহনবাবু একটু ব্যাপারটা পরিস্কার করে দিই। সে এক দুঃখের কথা। একে একে তো আপনি, মগনলাল তারপর আমাদের গ্রেট ডিরেক্টর শ্রী সত্যজিত রায় চলে এলেন এখানে। ওখানে তো ফাঁকা। অথচ পাবলিক ডিমান্ড। রায়বাবুর ফেলুদাকে সবাই দেখতে চায়। সাথে জটায়ু ও তোপসেকেও। ওনারই ছেলে সন্দীপ রায় পাবলিকের ডিমান্ড বুঝে ব্যবস্থা করলেন ফেলুদার সিরিজ। তবে তা বোকাবাস্কের জন্য। প্রতিভাধর অভিনেতা বেনুকে ফেলু মিত্তির সাজালো। আর জটায়ু করলো আমাদের গুপ্তকে। কিন্তু গুপ্ত হঠাৎ করে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে এলো এখানে। তারপর লালু এলো ওর জায়গায়, সেও চলে এলো এই অচেনা রাজ্যে।
মগনলালঃ হুম, আমি বসে বসে কি আর করবো। সব খোঁজ রাখি। মস্তি-ফস্তি আমার সহ্য হয় না। তাই এখানকার নিউজ পেপার আর চ্যানেল গুলো ফলো করি। সব খবর রাখি। তবে আমার কিন্তু আঙ্কেলকে বেশি পছন্দ। 😆😆 😆😆
জটায়ুঃ এই মরেছে রে। হাইলি সাসপিসিয়াস। (বলেই ফেলুদাকে জড়িয়ে ধরলো )
ফেলুদাঃ আরে ভয় নেই। কি করছেন।
(তিনমূর্তি জটায়ুর কান্ড দেখে হাসতে লাগলো ভীষণ)
ফেলুদাঃ তবে হ্যাঁ, বেনু কিন্তু দারুণ ভাবে মানিয়ে গেছে ফেলুদার সাথে। পাবলিকও ভালো ভাবে মেনে নিয়েছে। বেশ কটা ফেলুদা সিরিজ নিয়ে সন্দীপ সিনেমাও করে ফেললো। সব কটাই রেকর্ড করেছে। পাবলিকের কাছে দারুণভাবে সাড়া ফেলেছে। আর জটায়ুও কিন্তু দারুণ কামব্যাক করেছে 'বিভু'র মাধ্যমে।
জটায়ুঃ ও মাস্টার বিভু। সেই শিশুর ভূমিকায় অভিনয় করতো বিভিন্ন ঠাকুরের সিনেমায়।
ফেলুদাঃ একদম ঠিক লালমোহনবাবু। কিন্তু সেই বিভুও আর রইলো না। জটায়ু চরিত্র যেন একটা আপনার কথা অনুযায়ী "হাইলি সাসপিসিয়াস" হয়ে গেলো। সবাই চলে এসেছে এখানে। এরপর আর কোনো জটায়ু হয়নি। তবে আবির বলে একটা ছেলে ফেলুদা হয়েছে সেখানে জটায়ুর ভূমিকা নেই।
মগনলালঃ তাহলে স্বর্গরাজ্যে এখন আঙ্কেলদের ভিড় কি বলেন আঙ্কেল। (বলেই হো হো হো করে হাসতে লাগলেন)  
জটায়ুঃ ও মশাই, ও যে হাসলেই আমি কেমন বিপদের গন্ধ পাই (ফেলুদাকে দেখে)
লালুঃ এটা কে রে? তখন থেকেই শুধু কেঁপে যায়।
সিধুঃ ও আঙ্কেল। আমাকে দেখেও আপনি চমকাচ্ছেন নাকি।
গুপ্তঃ আরে ভয় পাবেন না। আমরা সক্কলে আছি তো নাকি।
ফেলুদাঃ লালমোহনবাবু, আপনি অযথা ভয় পাবেন না। তারপর শুনুন, কিছুদিন আগে সৃজিত একটা সিনেমা করছে ফেলুদাকে নিয়ে, আর ভালো কথা জটায়ুকেও পেয়ে গেছে আর তোপসে তো থাকবেই। আমার কিন্তু আবির ছাড়াও এই ছেলেটাকে খুবই পছন্দ ছিলো ফেলুদার চরিত্রের জন্য, টোটা। এখনকার জেনারেশনের জন্য একদম ঠিকঠাক। তবে আবির নিজের পায়ে কুড়ুল নিজেই মারলো। শরদিন্দু বাবুর ব্যোমকেশ ওকে বেশ মানিয়েছিলো। কিন্তু ফেলুদা করতে গিয়েই যত বিপত্তি। যাক, সে নিয়ে আমার কাজ নেই। আমি আছি আমার নতুন ফেলুকে নিয়ে, টোটা। ইন্ডাস্ট্রি এতদিন ঠিক ভাবে ব্যবহার করেনি ওকে। বোধ হয় এবার সঠিক সিদ্ধান্ত।
লালুঃ তা আঙ্কেল একটু অপ্সরাদের নাচ দেখবেন নাকি? সাথে আরও কিছু ব্যবস্থা আছে। বোতল চলে নাকি।
গুপ্তঃ আহা লালু, ছ্যাবলানোটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। জটায়ুবাবু, প্লিজ কিছু মনে করবেন না। এই লালুটা একেবারে ছোটলোক। কাকে কি বলতে হয় জানে না।
সিধুঃ একাবারে ছ্যাঁচড়া। স্বভাবটা কোনোদিনও চেঞ্জ হবে না। এখানে এসেও যত আজেবাজে কান্ড করে।
লালুঃ ওরে প্যাংলা, তোকে দেখাচ্ছি মজা। (বলেই মাথায় এক গাঁট্টা)
সিধুঃ ভালো হবে না বলে দিচ্ছি লালু। খুন করে ফেলবো। 😡😡 😡😡  
শ্যামঃ ওঃ কি হচ্ছে? তোদের ঝগড়া কি এখানেও চলছে। এখানে এসেও শান্তি নেই। তোরা জানিস না, মর্ত্যে কি হচ্ছে।
সকলে একত্রঃ কি হচ্ছে।
শ্যামঃ চল আমি ফেলুদার মতো করেই না হয় বলি।
ফেলুদাঃ দুনিয়াটা বুঝি শেষ হতে চললো। মানুষ মানুষে ভেদাভেদ। ভূপেনদার গানটা কেউ গায় না আজকাল "মানূষ মানুষের জন্যে", তাই বুঝি এই হানাহানি। তারপর পরিবেশের উপর অযত্ন। বাড়ির বড়দের সম্মান নেই। নেতারা নিজেদের আখের নিয়েই ব্যস্ত। সারা দুনিয়ায় এক মারণ রোগের জীবাণু হানা দিয়েছে, তারই জেরে বিশ্বসংসার অচল। মানুষের কাজ কর্ম নেই। সবই আজ অনলাইনে সীমাবদ্ধ। আমি এই বয়সে কাজে বেরোলাম। ব্যাস ছোট জীবাণু আমাকেও অ্যাটাক করলো। ৪১ দিন লড়লাম। বয়স হয়ে গেছে যে। তাই চলে এলাম তোদের কাছে।
ঠিক আছে এসে গেছি যখন, সবাই মিলে শান্তিতেই থাকবো। আমরা নতুন ভাবনায় মেতে উঠবো সবাইকে নিয়ে। থাকবো তো একসাথে নাকি?
সকলেঃ নিশ্চয়ই
ফেলুদাঃ আর অবশ্যই চাইবো, পৃথিবী ফিরে পাক তার স্বাভাবিক ছন্দ। মানুষ আবার মেতে উঠুক নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্মে, শিল্পকর্মে। সব কিছু নতুন ভাবে শুরু হোক ভেদাভেদ ভুলে, হিংসা-দ্বেষ ভুলে। মানবতার জয় হোক। এই কামনা করি। সকলে ভালো থাকুক।
🙏🙏🙏
- রাজকুমার ঘোষ
ফেলুদা তথা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর সাথে বাকি সকল অভিনেতার প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। 😍😍  

প্রকাশিতঃ বরাহনগর সাহিত্য দর্পণ, ২০১৯ ... সৌমিত্র সংখ্যা 

Friday, April 3, 2020

গল্প- নিশুতির কান্না



রাজকুমার ঘোষ -

ছোট থেকেই আমি ভিতু, হ্যাঁ ভিতু। ছোট বেলায় ঠাম্মা-দাদুর কাছে রূপকথার গল্প, ভূতের গল্প, তারপর একটু বড় হতেই বিভিন্ন রহস্য গল্প বন্ধুদের মুখ থেকে শোনা বা বই পড়া সবই হতো। কেন জানিনা অবচেতন মনে হাজার রকমের রহস্য ভয় মিশ্রিত ঘটনা চলে আসতো। আমার রহস্য ভয় মিশ্রিত মন থেকে বেশ কতগুলো গা ছম ছমে ঘটনার একটি যা আজ গল্প আকারে সকলের দরবারে হাজির করছি।   
বহুদিন আগের এক ঘটনা তখন সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি তিন বন্ধু, আমি, পুলক আর আনন্দ, তিনজনের মনের মধ্যে শহরের যান্ত্রিকতা, দুষন থেকে একটু বেড়িয়ে গ্রামের কোনো একটা জায়গায় ২-৩ দিন কাটানোর ইচ্ছা ছিলো। ইলেভেনে ভর্তি হয়েছিলাম, কাজেই পড়াশোনাও শুরু করে দিয়েছিলাম। ঠিক হয়েছিলো, শীতকালের কোনো এক সময়ে ৩ দিন ছুটি কাটাতে যাবো কোনো এক গ্রামের পরিবেশে। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের এই তিন বন্ধুর কারোর বাড়ি গ্রামে নয় বা সেভাবে কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। অবশেষে, পুলকের দুঃসম্পর্কীয় কোনো এক কাকিমার বাপের বাড়ি উদয়নারায়ণপুরের কাছে জয়নগরের কোনো এক গ্রাম্য জায়গায়, সেখানে যাবো ঠিক হলো। আমরা তিন বন্ধু শীতকালে ঐ জানুয়ারীর ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে চলে গেলাম কাকিমার সেই জয়নগরের বাপের বাড়ি। বেশ পুরোনো পাকা বাড়ি। কাকিমার দাদা মানে সম্পর্কে আমার মামাই হবেন। তিনি সেই বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন না। তিনি একটি নতুন বাড়ী করেছিলেন ওনার বাড়ির কাছেই, একটা ফাঁকা মাঠ ছিলো, তার মাঝেই সেই বাড়িটা। চারিদিকে কি সুন্দর অনেক গাছ বসিয়েছেন আম, নারকেল গাছ ছাড়াও বিভিন্ন ফুলের গাছ। সত্যি! তিনজন এই পরিবেশ দেখে ভীষণ ভাবে মোহিত হয়ে পড়লাম।  
এর মধ্যেই আমার মনে এ প্রশ্ন এসে গেলো, মামা ঐ পুরনো বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন না কেন? তা ওনাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম,
‘মামা, আপনি পুরোনো বাড়িতেই তো আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারতেন, এই নতুন বাড়িতে আমাদের জন্য সব কিছু ব্যবস্থা করছেন, আপনাকে অসুবিধায় ফেলেদিলাম আমরা’...
মামা জানালো,
‘আরে দূর, কি সব বলো তোমরা, আমি খুব খুশি। তোমাদের আপ্যায়ন করতে পারলে আমার ভালোই লাগবে। দেখে নিও তোমরা, একেবারে শহরের মত ব্যবস্থা করে রেখেছি এই বাড়িতে... কোনো অসুবিধা হবে না’  
যাই হোক, সত্যিই নতুন বাড়িতে দারুণ সব আয়োজন করে রেখেছেন উনি। তারপর পেল্লাই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে গ্রামের চারিদিক দর্শন করার জন্য তিন বন্ধু বেড়িয়ে পড়লাম। আগেই বলেছিলাম, আমি ভীষন ভীতু। পুলকেরও আমারই অবস্থা, কিন্তু আনন্দ খুবই সাহসী ছেলে। গ্রামে মামার যে বাড়ি আছে মাঠের মধ্যে, সেই মাঠ ছেড়ে বাইরের রাস্তায় যাবার বা মামার পুরোনো বাড়ি যাবার মধ্যে যোগাযোগ একটা সরু রাস্তা। এই রাস্তা ছাড়াও মাঠের চারিদিকে প্রায় জঙ্গলে ঘেরাবেশ কিছুদুরে আছে একটা কালী মন্দির এবং তার সাথে লাগোয়া একটা শ্মশান। আমার আর পুলকের তো বেশ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। সামনেই শ্মশান তার মানে রাতের বেলায় তেনাদের উপদ্রব হবে না তো! কি করতে যে মামা এই নতুন বাড়িতে শোবার ব্যবস্থা করলেন কে জানে। সেদিন রাতে খাবার খেয়ে রাত এগারোটা নাগাদ শুয়ে পড়লাম। মামা বলেছিলেন যে তিনজন চাইলে আলাদা তিনটে ঘরে আমরা থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি বা পুলক চাইনি। পুলকই বললো, ‘না মামা, আমরা একসাথেই এক ঘরে থাকবো’। মামাকে আমাদের ভয়ের ব্যাপারটা না জানানোই ভালো। আমার ঘুম এলোনা। আনন্দ দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। বোধ হয় পুলকেরও ঘুম আসেনি। মনের মধ্যে বারেবারে ঘুরপাক খাচ্ছে শ্মশানের ছবিটা। আর ভাবছি এই বুঝি তেনারা এসে আমাদের ঘাড় মটকাবে। এই ভাবতে ভাবতে একটু আচ্ছন্ন এসেছে। হঠাৎ গভীর রাতে মনে হচ্ছে একটা মেয়ে কন্ঠের হাসি দূর থেকে ভেসে আসছে, তারও একটু পরে দেখি ক্ষীন কন্ঠে করুণ কান্নার শব্দ আসছে। এই শুনে আমাদের পিলে চমকানোর অবস্থাচোখ বন্ধ রেখেও রাখতে পারলাম না। চোখ খুলতেই দেখি মুখের সামনে একটা মুখ। আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়ে চিৎকার করে উঠলাম, ‘কে রে?’। পুলকও চেল্লিয়ে বললো, ‘আমি রে’... ও বললো, ‘ভয়ে ঘুমোতে পারছি না। কি একটা হাসি আর কান্নার আওয়াজ আসছে’। আমাদের আওয়াজে আনন্দর ঘুমের দফা-রফা। সে উঠে লাইট জ্বালিয়ে বললো, ‘কি হলো রে তোদের? আচ্ছা ভীতুর ডিমের পাল্লায় পড়া গেলো তো’। আমরা আনন্দকে জানালাম এই আওয়াজ নিয়ে। খানিকক্ষণ তিনজন চুপ করে থাকলাম। তারপর আমরা সকলেই কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি আনন্দকে বললাম,
‘বিশ্বাস হচ্ছিলো না তো। এবার তুইও শুনতে পাচ্ছিস... বল, এবারে কি বলবি তুই?’
আনন্দ বললো, ‘আরে কোথায় একটা মেয়ে কাঁদছে, এই নিয়ে অত ভাবার কি হলো! এখন ঘুমোতো। কাল সকালে মামাকে জিজ্ঞেস করে নেবোএখন প্লিজ আমাকে ঘুমোতে দে’
আনন্দ ঘুমিয়ে পড়লো আবার। আমি আর পুলক পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা। সকাল বেলা ৮টার সময় মামার ডাকে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মামার সাথে আরও দুজন কাজের লোক এসেছেন আমাদের চা আর জল-খাবার নিয়ে। পুলকই একটু সাহস নিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মামা, এখানে কি ভূতের ভয় আছে? কাছেই তো শ্মশান তাই জিজ্ঞেস করছি’। মামা আমাদের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালেন, তারপর ‘হো...হো...হো’ করে অট্টহাস্যে হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমরা শহরের ছেলে হয়ে কি ভূতের কথা বলছো গো ভাগ্নেরা... কাছে শ্মশান আছে তো কি হয়েছে?... এইসব ফালতু চিন্তা করো না... ভালোভাবে গ্রাম ঘুরে আনন্দ করো’আমি বললাম, ‘গতরাত্রে একটা মেয়ে হাসি তারপর কান্নার আওয়াজ পেলাম যে’ ...
মামা এরপর বললেন, ‘তো কি হয়েছে? একদম বাজে চিন্তা করো না। ও কিছু না। কে না কে হাসছে বা কাঁদছে তাতে তোমাদের আনন্দের মাটি হওয়ার কিছুই নেই। বাদ দাও সব। এখন হাত মুখ ধুয়ে চা জলখাবার খেয়ে যাও ঘুরে এসো। কাছাকাছি দুই তিনটে মন্দির আছে... বেলায় খাওয়ার সময় আবার দেখা হবে’।
অগত্যা, আমি আর পুলক আশাহত হলাম। আনন্দ আমাদের তো গিলে খাবে। বললো, ‘কি ভীতুরে তোরা, তোরা আমার বন্ধু, ভাবতেই অবাক লাগে’।
আমরা চা-জলখাবার খেয়ে নিয়ে সেদিন গ্রামের রাস্তা দিয়ে অনেক পথ হাঁটলাম। সুন্দর গ্রামের পরিবেশ, নির্মল হাওয়ার আস্বাদ পেলাম। মামার কথা অনুসারে এখানে কতগুলো পুরনো মন্দির ছিলো দেখলাম। বিশেষ করে শ্মশানের পাশে কালীমন্দির আমি আর পুলক বেশ ভালো করে দেখলাম। আর শ্মশানের চারিদিক ভালো করে দেখতে থাকলাম। আনন্দ সেটা টের পেয়ে আমাদের বললো, ‘আজ রাতে তোদের দুজনের ঘাড় মটকাবে সেই মেয়েটা, দেখে নিস’ বলেই ‘হা...হা...হা’ করে হাসতে লাগলো। কিন্তু শ্মশানের আশেপাশে আমরা কিছুই পেলাম না। যাই হোক সেদিনের মত আমরা দুপুর বেলায় ফিরে খাওয়ার টেবিলে চলে এলাম। মামার পুরোনো বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার সুন্দর আয়োজন করেছে। খাসির মাংস, গলদা চিংড়ির মালাইকারি সহ আমাদের ভোজন দারুণ হলো। সাথে পায়েস, দু-তিন রকমের মিস্টি... দুর্দান্ত রান্না। পেট পুরে খাওয়ার পর আমরা চলে এলাম নতুন বাড়িতে। এসেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সেদিনের মত আর বেড়োয়নি। বাড়িতেই কাটালাম আমরা। মামা আর তার কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন, তাদের সাথে তাসের আড্ডা জমে গেলো। রাত্রি হতেই আমরা হালকা ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম কোথায় আমার চোখে? পাশে পুলকের অবস্থাও আমার মতোই। ওকে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে ঘুমাসনি?’ ও বললো, ‘ধুস, ঘুম আসবে কি করে? শুধু শ্মশানের কথা মনে পড়ছে’দুজনে মিলে অন্ধকারে বসে আছি আর নিজেদের মধ্যে মৃদু স্বরে কথা বলছি। আর আনন্দের নাকের ডাক শুনছি। রাত বাড়ার সঙ্গে চারিদিকের নিস্তব্ধতা আরও বাড়তে লাগলো। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ কানে আসতে লাগলো। সেই সকল নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে হঠাৎই গতকালের সেই মেয়ের কন্ঠে হাসি এবং তারপরের কান্নার আওয়াজ আসতে লাগলোআমরা দুজনে আতংকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। অজান্তেই আমরা দুজন চেঁচাতে লাগলাম। আমাদের চেল্লানোয় আনন্দের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ও বলল, ‘কি জ্বালা বলতো তোদের নিয়ে? নিজেরাও ঘুমোবি না আর আমাকেও ঘুমোতে দিবি না। আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে দেখছি। চল জামা কাপড় পড়ে নে। কোথায় তোদের ভয় দেখবো আমি’ এই বলে আনন্দ লাইট জ্বালিয়ে জামা কাপড় পড়ে নিলো। আমরা না চাইলেও ওর কথায় জামা কাপড় পড়ে নিলাম। আনন্দ ভীষণ রাগি, তাই বাধ্য হয়ে আমরা ওর কথা অনুযায়ী জামা কাপড় পড়ে রাতের অন্ধকারে এই অপরিচিত গ্রামের রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লাম। হাতে একটা টর্চ নিলো আনন্দ। বাড়ির সামনে সরু রাস্তা দিয়ে আমরা এগোচ্ছি। তার খানিকবাদে জঙ্গল, রাতের অন্ধকারে জঙ্গলটাকে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল দৈত্যের মুখ। ভয়ে ভয়ে আমি আর পুলক আনন্দের পিছু পিছু এগোচ্ছি। বিশেষ করে ঐ কান্নার আওয়াজ শুনে আমরা এগোচ্ছি। জঙ্গল পার হয়ে আমরা এবার চলে এলাম কালীমন্দিরের কাছে, তারপর শ্মশান। সেখানে এসে দেখি সেই কান্নার আওয়াজটা আরও জোরালো হয়েছে। আনন্দ সেই আওয়াজের সূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে। আমদের অবস্থা শোচনীয়। ভয়ে চেঁচাতে চাইলেও চেল্লাতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন বুকের মধ্যে আধ মন পাথর কে যেন চাপিয়ে দিয়েছে। সেই পাথর বয়ে বেড়াচ্ছি এই ঘন অন্ধকার রাতে। আনন্দ এগিয়ে চলেছে আর আমরা তার পেছনে। ক্রমশঃ ঐ আওয়াজের সন্নিকটে আসছি আমরা। শ্মশান পেড়িয়ে আরও একটি সরু রাস্তা, রাস্টার দুই পাশে ঘন জঙ্গল। অন্ধকারে সেই ভয়ার্ত পরিবেশে নিজেকে অসহায় লাগছে। আমি আর পুলক সেই ভয়ার্ত পরিবেশে নিজেদের আত্মসমর্পন করে দিয়েছি। কিন্তু আনন্দের সেইদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। অদম্য ওর মনের জোর। ও খুঁজে বের করবেই, কি এমন রহস্য এই আওয়াজের পেছনে। হাতে টর্চ নিয়ে ও এগিয়ে চলেছে আরও সামনে দিকে। রাস্তা পেরিয়ে চলে এলাম আমরা একটা জলা জমির মাঝে। দেখলাম একটা কুঁড়ে ঘর আছে সেখান, হালকা আলোর রশ্মি বেড়িয়ে আসছে সেই ঘর থেকে। মনে হচ্ছে আওয়াজটা সেই ঘর থেকেই আসছে। আনন্দ দেখলাম ঘরটাকে দেখেই ছুটতে লাগলো। ও বললো, ‘পেয়েছি... পেয়েছি... তোদের পেত্নীর খোঁজ পেয়েছি’। আমরাও ওর পেছন পেছন দৌড়তে লাগলাম ঘরটাকে উদ্দেশ্য করে। ঘরের কাছে আসতেই শুনতে পেলাম মেয়েলি কন্ঠের সেই ভয়ার্ত কান্না। আনন্দ সেই ঘরের দরজায় টোকা মারলো। আমরা ভাবছিলাম এখান থেকে পালাই যেদিকে মন চায়। আনন্দের ঘাড় মটকে খাক পেত্নী। ওর সাহস ওর কাছেই থাক। কিন্তু ঘরের দরজায় জোরে জোরে টোকা মারলেও দরজা কেউ খুলছে না। আনন্দ এবার বজ্রকন্ঠে বললো, ‘কে আছেন ঘরে, খুলুন বলছি’। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম দরজাটা খুলে গেলো। অন্ধকারে একটা মানুষ বেরিয়ে আসছে। আনন্দ তার মুখে টর্চ জ্বালিয়ে বললো, ‘কে তুমি?’ আমরা তো ভয়েই চোখ বন্ধ করে দিয়েছি। দেখলাম একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো, ‘আমি নিতাই গো বাবু, কিন্তু এত রাতে আপনারা এখানে কি করছেন বাবুরা?’ চোখ খুলতেই দেখি একজন রোগা পাতলা মানুষ, লুঙ্গি পড়ে আছে। যার নাম নিতাই। সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আনন্দ বললো, ‘এত রাতে কে কাঁদছে এখানে? আমরা আসছি সেই শ্মশানের পাশে যে বাড়িটা আছে সেখান থেকে। তোমার ঘর থেকে এই হাসি-কান্নার আওয়াজ আসছে আর আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। হচ্ছেটা কি? রাতের বেলা যত ইয়ার্কি!’ জবাবে নিতাই বললো, ‘আজ্ঞে বাবু, কিছু মনে করবেন না। আমার বউটা এক্কেবারে পাগল হয়ে গেছে, রাত হলেই ওর পাগলামীটা বাড়ে... আসলে তোমাদের মত একটা ছেলে ছিলো আমাদের। এক মাস হলো ছেলেটা সাপের কামড়ে মারা গেছে বাবু... আমার বৌটা তারপর থেকে পাগল হয়ে গেছে, কি করবো বলতে পারেন?’ আমরা আর কথা বাড়ালাম না। সেখান থেকে তড়িঘড়ি চলে এলাম বাড়িতে। হঠাৎই যেন চোখের সামনে কত কি ভেসে এলো বলে মনে হলো। মুহূর্তের ভাবনায় আমাদের চোখে কখন ঘুম চলে এলো জানিনা। সকাল ৯টায় মামা এসে দরজার কড়া নাড়তেই আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মামা আসতেই গতকালের রহস্য উদ্‌ঘাটনের ঘটনা সবিস্তারে জানালাম তাঁকে। মামা শুনে রীতিমত বাহবা দিলেন আমাদের সকলকে। বললেন,
‘তোমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য সার্থক তবে বলো। একটা দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হলো তোমাদের। তোমরা যেদিন বললে ঐ কান্নার আওয়াজটা সম্বন্ধে। আমি তোমাদের এড়িয়ে গেছিলাম, কিছুই জানাইনি আমি। যাই হোক খুব ভালো লাগলো তোমাদের সাহস দেখে’।
পুলক বললো, ‘আমাদের অত সাহস নেই মামা... এখানে যা কৃতিত্ব সবই আনন্দের। ঐ আমাদের হীরো। পড়াশোনা বলো, খেলাধুলা বলো আর দুঃসাহসিকতা বলো... আনন্দ আমাদের হীরো’।
আনন্দ বলে, ‘আরে এই অভিযান আমাদের সকলের’।
মামা বললেন, ‘নিতাইয়ের একটা ছেলে ছিলো তোমাদের বয়সী, একমাস আগে সাপের কামড়ে ছেলেটি মারা যায়, তারপর থেকে নিতাইয়ের বৌ পাগল হয়ে যায়। রাত হলেই বৌ টা হাসতে থাকে, তারপর কান্নাকাটি করে। একমাত্র ছেলেতো, শোকে দুঃখে পাগল হয়ে গেছে। আর একটা কথা যে রাস্তা দিয়ে তোমরা ওদের বাড়িতে গেছো, সেই রাস্তা মোটেই ভালো না... কারণ ঐ রাস্তাতেই নিতাইয়ের ছেলে সাপের কামড়ে মারা যায়। ঐ রাস্তায় সাপের উপদ্রব ভীষণ। বলতে গেলে ঐ রাস্তা দিয়ে কেউ যায়না। তোমরা ঐ রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসেছো মানে অসাধ্য সাধন করেছো। যদিও সাপের উপদ্রব দিনের বেলাতেই বেশি। কিন্তু তোমাদের সাহসিকতার কথা যতই বলি ততই কম হবে। খুব খুশি আমি। এইভাবে তোমরা এগিয়ে চলো’। সেদিন আমরা বেলার লাঞ্চে মহাভোজ করে বিকেলের ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে এলাম।  
আজও রহস্য বা অ্যাডভেঞ্চারের কোনো ঘটনা বলতে গেলে আমার স্মৃতির দোরগোরায় চলে আসে এই ঘটনাটা। এখনও যোগাযোগ আছে আমাদের তিন বন্ধুর সাথে। পুলক আর আমি আমাদের জায়গাতেই আছি। আমরা একই অফিসে চাকরী করি। মোবাইলে, ফেসবুকের মাধ্যমে আনন্দের সাথে যোগাযোগ আছে। ও এখন মিলিটারিতে আছে কর্ণেলের পদে। কখনও কাশ্মীর, কখনো বাংলাদেশের বর্ডার, কখনও কার্গিল, এইভাবে ওর ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। ওর অসীম সাহস ছিলো, এই ধরণের পদই ওর জন্য যোগ্য। ও আমাদের গর্ব। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে এই ধরণের একটি ঘটনায় ওর সাথে আমরা ছিলাম।             

প্রকাশিতঃ ASPIRATION MAGAZINE, BPIE COLLEGE… BISHNUPUR, 2019