Thursday, August 25, 2022

নেলোর প্রেমপত্র


রম্যরচনা -

রাজকুমার ঘোষ

গুচ্ছের বিভ্রান্তি নিয়ে নেলোর মত একটা মানুষ এই জগতে থাকতে পারে, তা ওকে দেখে বোঝা যায় না। রোগা-পটকা চেহারার নেলো মনে–প্রাণে ছুকছুক বাই গ্রস্ত এক পাবলিক, যদিও সেটা কেউ বুঝতে পারে না বা নেলো কাউকে বুঝতে দেয় না। তার যে কিসের দুঃখ, কিসের হতাশা আবার তার যে আনন্দ কখন আসে সে নিজেও জানেনা। তার নাম নিলমণী পাত্র, কিন্তু বন্ধুদের সৌজন্যে সেটা নেলোতে এসে ঠেকেছে।

এই নেলো বিভ্রান্ত লগ্নেই জন্মেছে বলে মনে হয়, তার জীবনের প্রথম চুলকানি, দুঃখিত বিভ্রান্তি … সে নাকি প্রেমে পড়েছে। একেই তার হাড়ভাঙ্গা লিকলিকে চেহারা। প্রেমের জোয়ারে তার নাওয়া খাওয়া ঘুমের দফারফা। এরপর তার চেহারা কোথায় রাস্তাঘাটে মিশে যাবে সেই নিয়েই ওর বাবা-মার চিন্তার শেষ নেই। নেলোর ঠাম্মা বলে, "কিরে মুখপোড়া হাড় মিনসে, এইতো চেহারা, বলি কোন মেয়ে স্বপ্নে আসে তোর? ওলাউটো কলেজে প্রেম করতে যাস না পড়তে যাস" ঠাম্মার গালি খাওয়ার ভয়ে নেলো ঠাম্মার ত্রি-সীমানায় ঘেঁষে না। 

সবে নেলো স্কুল গন্ডি পাড় করে কলেজে এন্ট্রি নিয়েছে, সেখানে গিয়েই এক মেয়েকে দেখে নেলোর চুলকানি শুরু, মানে পেত্তম প্রেম জেগে ওঠা। ব্যাস গড় গড় করে একটা লাভ লেটার লিখে জীবনে প্রথমবার প্রোপোজের জন্য বাসস্ট্যান্ডের দিকে গিয়েছিল, মেয়েটি তখন বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। মেয়েটির কাছে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই নেলো দুরন্ত নাচতে শুরু করে দিল। নেলোর নাচানাচি দেখে আশেপাশে ও দূর থেকে দেখা ওর বন্ধুরাও অবাক৷ সবাই ভাবছে ব্যাপার কি? কিছুক্ষণ পর মেয়েটার একটা সপাটে চড় নেলোর গালে পড়তেই আশেপাশের পরিবেশ খানিকটা থমকে গেল। 

ব্যাপারটা হয়েছে কি! নেলোর পকেট থেকে চিঠি বের করার বদলে বেরিয়ে এল সালিকল মলম ! বিভ্রান্তির সেই শুরু, নেলোর হাতে স্যালিকল

দেখে মেয়েটি ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে দিল ।… পরে জানা গেল, নেলোর চুলকানি শুধু মনের নয় অন্য চুলকানিও আছে যার জন্য সালিকল পকেটে রাখার দরকার হয়। টেনশনে নাকি নেলোর দ্বিতীয় চুলকানিটা প্রকট হয়ে ওঠে এবং তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। সেদিনের কেসটা তাই হয়েছিল, টেনশনে নেলোর চুলকানি শুরু আর পকেটে হাত দিতেই চিঠির বদলে সালিকল আর সেই সাথে নাচানাচি। … আহারে নেলো, জ্বালার চেয়ে যন্ত্রনা বেশি, বিভ্রান্তির শুরু এবং শেষ। প্রথম প্রেমপত্র লিখে সে গিয়েছিল মেয়েটির কাছে৷ নিজের হাতে প্রেমপত্রসহ উপহার দেবে ভেবেছিল। সব জলে গেল। হাতে চলে এল স্যালিকল৷ প্রেমের যবনিকা পতন৷

Tuesday, August 23, 2022

আমার আমি - (২য় ভাগ)

 

- রাজকুমার ঘোষ - ৬.৮.২০২২ 

জীবনে চলার ক্ষেত্রে আমার আমিকে নিয়ে বেশ শঙ্কিত ছিলাম। সেই ছোট্ট থেকে শুরু হয়েছে জার্ণি। আমি নিজেকে কিভাবে সবার কাছে নিবেদন করব। ছোট্ট বেলায় না হয় মা, বাবা ও বাড়ির বড়দের কোলে ঘুরে বেড়াতাম। আমি জানতাম না আমি কেমন। পরে অনেকেই অনেক গল্প করেছেন। কিন্তু তাও... নিজের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস তৈরি হয়নি। আজ যখন আমি 'আমার আমি'কে নিয়ে লিখতে বসেছি, মনের মাঝে কত যে কথা চলে আসছে তা বলাই বাহুল্য। ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত মা আমার আমিত্বকে নিশ্চয়ই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। শুধু মা নয় বাবাও বলেছিলেন, প্রথম দিন, "বাবা যদি বাথরুমে যেতে ইচ্ছে করে। স্কুলের দিদিমনিদের বলিস, তা নাহলে মুশকিল হয়ে যাবে" ... কিন্তু যা হয় আমার আমিত্ব আটকেছিল ব্যাপারটা হজম করতে। কাজেই... আমার পরণে থাকা প্যান্টের দফারফা। বাড়িতে এসে মা'এর প্রচণ্ড চিৎকার আমার আমিত্বকে জাগাতে পারেনি।
পরবর্তীকালে কিভাবে যে রূপম, মলয়, বিপ্লব ও আরও অনেকের সাথে  বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এবং বেশ মনে আছে আমার আমিত্ব এতটাই শক্তিশালী যে আমি স্কুলে না গেলে তারা বাড়ি চলে আসত। খোঁজ নিয়ে আসত। আমার আমি বড়ই বন্ধু বৎসল ছিল সেই ছোট্ট থেকে।
প্রাইমারী স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে গেলেও আমি যোগাযোগ রেখেছিলাম তাদের সাথে। কিন্তু সময়ের স্রোতে সবাই যে যার আমিত্বে ডুবে গেছে। মনে আর কেউ রাখেনি। আমি আমার আমিকে নিয়ে পরের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে নতুন আমিত্বে প্রবেশ করলাম। প্রিয় বন্ধু রাজা সেই ছোট্ট বেলায় ক্লাস ফাইভ থেকে আজও আমার সাথে সমানভাবে পাশে আছে। দুজনের আমিত্বে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী বন্ডিং। আজ আমার পড়ালেখা, এবং আমাদের গড়ে তোলা পত্রিকার কাজকর্মে সবচেয়ে বেশীভাবে সমর্থন ও সাহস যোগান দেয় বন্ধু রাজা। অনেক অনেক ছাত্রের গুণমুগ্ধ স্যার রাজা (সৌরভ মুখার্জি) আজকের এই যান্ত্রিক, ভদ্র মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষদের সমাজেও একজন সত্যিকারের সবুজ হৃদয় মানুষ। যার স্পর্শে থাকলে আমার আমিত্ব সক্রিয় হয়ে ওঠে। বন্ধু তুই ভালো থাকিস। বাকি জীবনেও তোর আমি আর আমার আমিতে মিলেমিশে থাকতে পারি।
তাই পরের পর্বে যাবার আগে আমি আমার বন্ধুকে নিয়ে লেখা একটি পুরোনো কবিতা দিলাম...

বন্ধু

ছোট বেলার সাথী তুই, ভুলিনি তোর কথা...

মান অভিমান দূরেই থাকুক, সেটাই মূল কথা
বন্ধু তোর কাছে গেলেই, ভুলে যাই সব ব্যথা
টানা পোড়েন, বাক বিতন্ডা রেখেছি সব দূরে
ছোট থেকেই বন্ধু তুই আছিস হৃদয় জুড়ে

ছোট বেলার সাথী তুই, ভুলিনি তোর কথা...

ভাবনার ব্যাপার নেইকো কিছু বন্ধুদেরই মাঝে
পেশা নেশা যাদের সাথে তাদের কাছেই সাজে
হঠাৎ কোনো দমকা হাওয়ায় যাবেনা তো রুখে
যেথাই থাকিস বন্ধু তুই, থাকিস পরম সুখে।

ছোট বেলার সাথী তুই, ভুলিনি তোর কথা...

মনের মাঝে নয়কো দ্বিধা, থাকবে না কোনো দ্বন্দ্ব
ছোট থেকেই জানি তোকে, ভাবিনি কখনো মন্দ।
এবার যদি আসে কোনো অবাঞ্ছিত অশান্তি
মাথা পেতে নেবো দায়, যতই আসুক ক্লান্তি

ছোট বেলার সাথী রে তুই, ভুলিনি তোর কথা...

Monday, August 15, 2022

নাটকঃ স্বাধীনতার মানে..

আজ স্বাধীনতা দিবসের দিনে, আমার ছেলে ঋষভের পরিচালনায় ওদের স্কুল সেন্ট মেরি কনভেন্ট স্কুলে নাটকটি পরিবেশিত হয়েছে।

নাটকের নামঃ
স্বাধীনতার মানে
রাজকুমার ঘোষ

প্রথম দৃশ্য
[আলোর দূত চ্যানেলের দুই রিপোর্টার নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিচ্ছে আজকের স্বাধীনতা দিবসে তাদের চ্যানেলের লাইভ প্রোগ্রাম কিভাবে এগোবে। সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতা দিবসে গুরুত্ব কতখানি।] 
রিপোর্টার-১ –
আমাদের চ্যানেল আলোর দূত এর তরফ থেকে সকল দর্শকবৃন্দকে জানাই স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমাদের ভারতবর্ষ মানে বীর নেতাজির ভারতবর্ষ, দেশের প্রতি তাঁর আত্মত্যাগ এবং হাসিমুখে নিজের মাতৃভূমির জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া বীর বিপ্লবী শহিদ ক্ষুদিরাম বসুকে আজকের দিনে প্রণাম জানাই। এছাড়াও আরো অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর যোদ্ধাদের আত্ম বলিদানে ২০০ বছর ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হয়ে থাকা মাতৃভূমিকে মুক্ত করেছেন৷ সেই মুক্তির আনন্দে আমরা দেশবাসীরা ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করছি। তাই আজকের দিনটা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গর্বের দিন৷
রিপোর্টার-২ –
একদম ঠিক। ১৫ই আগস্ট এর দিনেই আমরা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান থেকে ইন্ডিয়ান হয়েছি। what is glorious day. আজকের দিনে আমরা চারপাশে দেশাত্মবোধক গান শুনতে পাচ্ছি, বিভিন্ন জায়গায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হচ্ছে। গর্বের সাথে তিরঙ্গা পতাকা উত্তোলন হচ্ছে৷ এসব দেখে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে।
রিপোর্টার-১ - 
ঠিক আছে এবার তাহলে চলে আসি আমাদের আজকের অনুষ্ঠানের মূল বিষয়, স্বাধীনতা মানে কি? আজ আমরা লাইভ টিভিতে দেখতে চাই যে আমাদের প্রিয় দেশবাসী তথা ভারতবাসী, তাদের কাছে স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব কতখানি। তাদের মুখেই জানতে চাই স্বাধীনতা মানে কি?
রিপোর্টার-২ –
আশা করি দর্শকবন্ধুরা আপনারা এই অনুষ্ঠানটি উপভোগ করবেন এবং সঙ্গে থাকবেন চ্যানেল আলোর দূত এর সাথে।

দ্বিতীয় দৃশ্য
[তরুণ দুই রিপোর্টার যখন তাদের চ্যানেলে স্বাধীনতা দিবসে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন সেই নিয়ে লাইভ অনুষ্ঠান করা নিয়ে উৎসাহিত ঠিক সেই সময়ে শহরের এক পরিবারে বাবা-ছেলের কথোপকথন। বেলা ১০টা পর্যন্ত ছেলে ঘুমিয়ে আছে। বাবা বিরক্ত সহকারে ছেলের কাছে এসেছে।] 
বাবা-
( নিজের সাথে কথা বলছে) কি হবে আজকালকার ছেলেদের, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেই না, রাত জেগে মোবাইলে কি যে করে কে জানে? ( ঘুমন্ত ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে) এই মুখপোড়া, আজকে আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আজ অন্তত সকাল সকাল ওঠ। ছাদে যা, পতাকা উত্তোলন কর। পাশের বাড়ির নিলুকে দেখে শেখ। কিছু শেখ... (ছেলেকে আবার ধাক্কা দেয়)
[একরাশ বিরক্তি নিয়ে ছেলে তার বাবাকে] 
ছেলে-
ধুত্তর, নিকুচি করেছে। স্বাধীনতা দিবস তো আমার কি? আমাকে একটু স্বাধীনভাবে ঘুমোতে দাও প্লিজ। কানের সামনে বেকার ফ্যাচ ফ্যাচ করছ কেন?
বাবা-
কি বাঁদর রে! বাবার সাথে এইভাবে কেউ কথা বলে?
ছেলে-
না, বলবে না। ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়ে স্বাধীনতা ফুটাচ্ছে। যাও যাও বাজারে গিয়ে খাসির মাংস কিনে নিয়ে এসো, তাহলেই স্বাধীনতা বেশ জমে যাবে। হ্যাপি স্বাধীনতা দিবস! ইনজয় বাবা, ইনজয়!!
বাবা-
ছি ছি ছি... কুলাঙ্গার একটা! আমার কপালেই এরকম একটা জুটলো! হায় ভগবান।

তৃতীয় দৃশ্য
[রিপোর্টার দুজন প্রথমেই গেল শহরের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মধ্যে। সেখানে দুই ছাত্রের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গেল। তারা এগিয়ে গেল ছাত্রদের কাছে।] 
রিপোর্টার-১-
হ্যালো student's
ছাত্র-১- 
হ্যালো বলুন
রিপোর্টার-১-
তোমরা নিশ্চই জানো যে আজ স্বাধীনতা দিবস 
ছাত্র-১-
কি দিবস? আপনি কে? আর আপনাকে বলেই কি হবে?
রিপোর্টার-২-
আমরা আলোর দূত চ্যানেল থেকে কভার করতে এসেছি। আজ স্বাধীনতা দিবস নিয়ে তোমাদের থেকে মতামত জানতে চাই?
ছাত্র-২-
ও আচ্ছা! তাই নাকি? চ্যানেল থেকে এসেছেন! ওয়েট ওয়েট, একটু চুলটা ঠিক করে নিই। (একটু ঠিক করে নিল নিজের চুল এবং পরণের স্কুল ড্রেস ঠিক ঠাক করে নিল)  হুম বলুন..কি যেন সাধারণ দিবস জিজ্ঞাসা করছিলেন?
রিপোর্টার-১-
আরে স্বাধীনতা দিবস মানে ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে।
ছাত্র-১-
ওই একই হলো। যা স্বাধীনতা, তাই সাধারণ। এই দিনে কি আমরা নাচবো নাকি গাইবো!
রিপোর্টার-২-
তোমাদের নাচতেও হবে না আর গাইতেও হবে না। স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব কি তোমাদের কাছে জানতে চাইছি।
ছাত্র-২-
স্বাধীনতা দিবস মানে ছুটি ছুটি আর ছুটি। মানে ফুল মস্তি। বন্ধুরা মিলে শুধু পার্টি হবে! 
রিপোর্টার-১-
একি! তোমরা নিশ্চই শুনেছো, ১৯৪৭ সালে আজকের দিনে আমরা ভারতবাসী অত্যাচারী ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছি। কত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও তাদের প্রাণত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। সেই দিবস কি আমরা পালন করব না? 

ছাত্র-১-
তাতে আমাদের কি? ওই সময় লড়াই করার দরকার ছিল তাই তারা লড়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল।
ছাত্র-২-
আপাতত আমরা আমাদের ছুটির সময় কাটাই নিজেদের মতো করে। ফুল মস্তি করে। এসব বেকার প্রশ্ন করে আমাদের বোর করবেন না। আজ শুধু ইনজয় আর জমিয়ে খানাপিনা।
রিপোর্টার-২-
ও আচ্ছা আচ্ছা, বুঝলাম।
[দুই রিপোর্টার ছাত্রদের কথা শুনে ভীষণ হতাশ। সেখান থেকে তারা চলে গেল।] 

চতুর্থ দৃশ্য
[ঐ স্কুলেই আজ একটি ক্যুইজ কন্টেস্ট ইভেন্ট হবে। রিপোর্টার দুজন  এসেছে ইভেন্টের স্থানে। পারলে আজ তারা স্বাধীনতা দিবসে স্কুলের এই ক্যুইজ কন্টেস্ট অনুষ্ঠান কভার করবে। ইভেন্টের আগে তারা উপস্থিত তিনজন প্রতিযোগী (যাদের মধে দু'জন ছাত্র ও একজন ছাত্রী)কে আজকের এই বিশেষ দিনের মাহাত্ম্য কি জানতে চায়...] 
রিপোর্টার-১-
আজ আলোক দূত চ্যানেলের তরফ থেকে আমরা এসেছি তোমাদের স্কুলের ক্যুইজ কন্টেস্ট অনুষ্ঠান কভার করতে। তবে তার আগে আমরা চ্যানেলের একটি লাইভ অনুষ্ঠানের জন্য তোমাদের কাছে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।
ছাত্র-১-
হ্যাঁ বলুন।
রিপোর্টার-১-
আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৭ সালে ১৫ই আগষ্ট আমাদের ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। তোমরা নিশ্চই জানো। তা, প্রিয় Student's, তোমাদের কাছে প্রশ্ন, স্বাধীনতা মানে কি?
ছাত্র-১-
ও আচ্ছা। আজকের দিনে ভারতবর্ষের সংবিধান অর্থাৎ Indian Constitution গঠন হয়েছিল। 
রিপোর্টার-২-
বলো কি? (আঁতকে ওঠে এবং লজ্জিত হয়ে) আচ্ছা বলো, ভারতের জাতীর জনকের নাম কি?
ছাত্রী-
জওহরলাল নেহরু। (জবাব শুনে দু'জন রিপোর্টার মাথায় হাত দিয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করে)
রিপোর্টার-১-
তাহলে মহাত্মা গান্ধী কে ছিলেন?
ছাত্র-২-
আরে ওইতো আমাদের টাকার নোটের ওপর যার ছবি আছে।
রিপোর্টার-২-
হ্যাঁ, ঠিকই। উনি ভারতবর্ষের জন্য কি ছিলেন, সেটা নিশ্চই জানো তো?
ছাত্রী- ওই তো, উনি টাকার মেসিন আবিস্কার করেছিলেন। সেইজন্যই তো নোটের ওপর ওনার ছবি।
রিপোর্টার-১-
ওকে, ওকে। বুঝে গিয়েছি, তোমরা কি পড়াশোনা করছো... (বিরক্ত প্রকাশ করে) সহজ সরল জ্ঞান তোমাদের একদমই নেই। ভীষণ লজ্জার। ছিঃ

ছাত্র-১-
ঠিক আছে। এবার এখান থেকে যান তো। বেশি জ্ঞান দেবেন না। নিজেদের কাজ করুন।
[ভীষণ হতাশ হয়ে দুই তরুন রিপোর্টার সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।] 

পঞ্চম দৃশ্য
[দুই রিপোর্টার স্কুল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসে। দেখে একজন কিশোর রাস্তায় কানে হেড ফোন দিয়ে নাচতে নাচতে যাচ্ছে। রিপোর্টার দু'জন সেই কিশোরটির দিকে এগিয়ে যায়।] 
রিপোর্টার-১-
ও ছেলে শুনছো...
কিশোর ছেলেটি –
কে বাবা তুমি? দেখতে পাচ্ছো না আমি গান শুনছি।
রিপোর্টার-১-
আমরা আলোক দূত চ্যানেল এর তরফ থেকে আজ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে তোমাদের কাছে জানতে চাই, স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব তোমার কাছে কতটা? স্বাধীনতা মানে কি?
কিশোর ছেলেটি –
স্বাধীনতা দিবস মানে আজ হলি ডে। আমার কাছে রক এন্ড রোল এন্ড ডিসক উইথ মিউসিক... ইয়ে ইয়ে (নাচতে নাচতে)
রিপোর্টার-২-
একি ১৯৪৭ সালে আজকের দিনে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। আজ সকল ভারতবাসীর কাছে একটি গর্বের দিন। জায়গায় জায়গায় ভারতের পতাকা উত্তোলন হচ্ছে। দেশাত্মবোধক গান হচ্ছে।
কিশোর ছেলেটি-
তো...! যারা করছে করছে, আমার কি? বেকার প্রশ্ন করে আমার ম্যুডটাই নষ্ট করে দিলেন। আমি আপাতত আপনাদের থেকে স্বাধীন হয়ে চাই। যান তো এখান থেকে... যত্তসব।
[এরপর রিপোর্টারকে একরকম ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়] 
রিপোর্টার-১ –
(রিপোর্টার-২ কে বলে) কেমন সব দেশবাসী আমরা। আমরা নিজেদের স্বাধীনতা দিবস নিয়ে কত উদাসীন। ভীষণ খারাপ লাগছে বন্ধু।
[এরপর একজন বয়স্ক ব্যক্তি, (যার একটি হাত নেই) সেখান দিয়ে হেঁটে যান। কিছু দূরেই এক হকার তার ঝোলার মধ্যে একটি কাগজের তিনরঙের পতাকা রাখতে যায় এবং সেটা রাস্তায় পড়ে যায়। বয়স্ক ব্যক্তিটি তৎক্ষনাৎ সেই পতাকাটি অন্য হাতে তুলে নিয়ে হকারের হাতে দিয়ে দেন।]  
বয়স্ক ব্যক্তি –
জয় হিন্দ। (স্যালুট করে)
হকার –
জয় হিন্দ! (স্যালুট করে)
বয়স্ক ব্যক্তি –
পরিস্থিতি যেমনই হোক, মা'কে সবসময় রক্ষা করবে।
[দুই রিপোর্টার ওই ব্যক্তিকে দেখে তার কাছে চলে আসে।]

রিপোর্টার-২-
আজ আমরা যেখানেই গিয়েছি। শুধুই হতাশ হয়েছি স্যার। আপনাকে দেখে ভীষণ ভালো লাগল। আজ স্বাধীনতা দিবসের দিনে আপনাকে দেখে মনে ভীষণ শান্তি পেলাম।
রিপোর্টার-১-
স্যার আজ আমরা আলোক দূত চ্যানেল থেকে রাস্তায় বেরিয়েছি। সকল সাধারণ মানুষের কাছে জানতে চাইছি, আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতার গুরুত্ব আপনার কাছে কতখানি? আপনার মতামত জানলে ভালো লাগবে।
বয়স্ক ব্যক্তি –
স্বাধীনতা মানে আমার মা'র মুক্তি, আমার মুক্তি, সমগ্র ভারতবাসীর মুক্তি। ১৯৪৭ সালে আজকের দিনে পরাক্রমশালী ইংরেজদের হাত থেকে আমার মাতৃভূমি তথা ভারতবর্ষ মুক্ত হয়। সেইদিনের কথা ভেবে আমার বুক গর্বে চওড়া হয়ে যায়। আজ স্বাধীনতা দিবসের দিনে যে সকল বীর সৈনিকরা মাতৃভূমির জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন বা এখনো সীমান্তে দিয়ে চলেছেন তাদের প্রতি আমার অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করি। সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। জোর গলায় বলতে চাই জয় হিন্দ। বন্দেমাতরম।
রিপোর্টার-২-
স্যার আজ আমাদের ভীষণ প্রাপ্তি হল আপনাকে পেয়ে।
রিপোর্টার-১-
আপনার পরিচয় জানতে পারলে ভালো লাগবে স্যার। আর এই যে আপনি এই কাগজের পতাকাটি হাতে তুলে স্যালুট জানালেন, আপনার কাছে এই কাগজের পতাকাটির মূল্য কি?
বয়স্ক ব্যক্তি –
এই পতাকাটি মাথার ওপর ধরে রাখা এবং আমার মাতৃভূমিকে রক্ষা করাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও কর্তব্য বলেই মনে করি। যতদিন বেঁচে থাকব তা রক্ষা করে যাব জীবনের মূল্য দিয়ে। আজ আমাদের দেশের হাল যেমনই হোক না কেন আমার এই জীবন মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য উজার করে দেব। তার কারণ আমি একজন যোদ্ধা। ইন্ডিয়ান আর্মির এক বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলাম। আমি গর্ব বোধ করি। ইন্ডিয়াম আর্মিতে থাকাকালীন সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছি। প্রতিবেশী দেশের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করেছি। আমাদের দেশকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেক শত্রু সৈনিককে হত্যা করেছি। আমার একটি হাত আমার মা'কে রক্ষা করতে গিয়ে খোয়া যায়। তাতেও আমি দমে যায়নি। আর্মি থেকে অবসর নিয়ে আমি আজও  আমার ভারতবর্ষকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে যাই। তাই পতাকাটিকে আমি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখতে পারি না। আমাদের তিরঙ্গাকে সবসময় উঁচুতে দেখতে চাই। আমি সকল ভারতবাসীকে বলতে চাই এই তিরঙ্গার মূল্য বোঝো। নিজের দেশ তথা নিজের মা'কে বোঝো। সবাই এক হয়ে বলো, জয় হিন্দ, জয় ভারত, বন্দেমাতরম।
[ওখানে উপস্থিত সকলে মিলে একযোগে বলল, জয় হিন্দ, জয় ভারত, বন্দেমাতরম।] 
রিপোর্টার-২-
আপনার কথা শুনে আজ স্বাধীনতার মূল্য আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের মন ভরে গেল। (বাকি সকলের উদ্দেশ্যে) স্বাধীনতা দিবসের দিনে আসুন সকলে ব্রতী হই, আমরা সবাই আমাদের প্রাণ দিয়ে আমাদের দেশকে বাইরের শত্রু বা আভ্যন্তরীন শত্রুদের হাত থেকে যেন রক্ষা করতে পারি। আমাদের তিরঙ্গাকে সবসময় মাথার ওপর রাখতে পারি। তিরঙ্গার অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেব না। আমাদের দেশ তথা আমাদের মা'কে সবাই মিলে যেন আগলে রাখতে পারি। জয় হিন্দ, জয় ভারত, বন্দেমাতরম। 
[দূরে কোথাও লতা মঙ্গেশকরের কন্ঠে "বন্দেমাতরম" গানটি হচ্ছে। সবাই স্যালুট করছে আর পতাকাটি নিয়ে হকারটি একটি উঁচু জায়গায় কাঠের খুঁটিতে আটকে দিচ্ছে।]
-সমাপ্ত-

ছবি সৌজন্যেঃ ব্রজেশ নন্দী, কেজি শ্রেণী


Saturday, August 13, 2022

কোলাহল মুক্ত জিরো পয়েন্ট

 

~ রাজকুমার ঘোষ 


শহরের কোলাহলে জটিল জীবন কয়েক মণ ভার নিয়ে মানুষের জীবন দিশাহারা করে দিচ্ছে দিনের পর দিন। সেখান থেকে বেরোতে পারা সম্ভব তো নয়ই, বরং বরং দিন দিন এই ভার জেঁকে বসেছে। তবুও ইচ্ছা হয় সেই ভার থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে। সেই কারণেই বাঙালি মন চায় কোলাহল মুক্ত জীবন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। মাঝেই মাঝেই পাহাড়ের দিকে মন টানে। আর পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার মজাই আলাদা রকমের, সেটা যদি আবার সিকিমের মত পাহাড়ি রাজ্য হয়। ভাবা যায় গোটা রাজ্যটাই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত, যার রাজধানী গ্যাংটক হল তার মধ্যমণী । বেশ কয়েক বছর আগে আমরা দার্জিলিং-এ যাব বলে বেড়িয়েছিলাম, কিন্তু রাজনেতিক অস্থিরতার দরূণ আমরা সিকিমে চলে এসেছিলাম। তখন আমরা ছাঙ্গু, বাবাধাম, ইয়ুমথাংগ পর্যন্ত্যই আটকে গিয়েছিলাম, কিন্তু লোক মুখে শোনা জিরো পয়েন্টকে না দেখেই ফিরে আসতে হয়েছিলো। কাছে এসেও দেখতে না পেয়ে ভীষণ আক্ষেপ হয়েছিলো । মনের সেই ইচ্ছাটা ভাগ্যিস ধরে রেখেছিলাম । তাই গতবছর পূজোর পর টার্গেট করেই রেখেছিলাম যে আবার আমরা গ্যাংটক যাব, মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই জিরো পয়েন্ট ।   

          ইচ্ছা অনুযায়ী লক্ষী পুজোর ঠিক পরের দিনই আমরা দল বেধেঁ গ্যাংটক থুরি জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম । প্রায় ৮ জন নিয়ে আমাদের দল বেশ ভারী ছিলো । স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সবাই খোশমেজাজে। আমার হিরো মানে আমার ছেলে ঋষভ তো বেজায় খুশি। তার কাছে এই ঘুরতে যাওয়া এক বিরাট অনুভব, সে আমার কাছে সিকিম তথা গ্যাংটক এমনকি জিরো পয়েন্ট নিয়েও জেনে নিয়েছে ।

শিয়ালদাহ থেকে রাতের কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস ধরে আমরা সবাই গ্যাংটক পৌছে গেলাম পরের দিন সকালে, তারপর সেখান থেকে ট্রাভেলের গাড়িতে চেপে পাহাড়ী রাস্তার অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা বিকালে গ্যাংটক পৌঁছে গেলাম। সেদিনের মত বিশ্রাম নিয়ে তার পরের দিন থেকেই আমাদের চোখ থাকার স্বার্থকতাটা বুঝতে পারলাম। পরের দিন ছাঙ্গু ও বাবাধাম, তার পরের দিন পশ্চিম সিকিমের সান্ড্রাপ্সি, সাই বাবার মন্দির ও চারধাম দেখে আমরা সবাই অভিভূত। আমাদের খুব ইচ্ছা ছিলো যে ছাঙ্গু ও বাবাধামের বরফ পড়া দেখবো, কিন্তু বেশ হতাশ হয়েছিলাম। সেভাবে কিছুই দেখতে পেলাম না। যেদিন গিয়েছিলাম ঠিক তার পরের দিনই নাকি বরফ পড়েছে। হতাশ যেন আরো বেড়ে গেলো। বৃষ্টি পড়ায় নাকি ওখানে বরফ পড়েছে। তা আমরা গ্যাংটকের যে হোটেলে ছিলাম, সেখানকার ম্যানেজার বললো জিরো পয়েন্টে বরফ নাকি পাবোই, শুনে বেশ আনন্দ পেলাম। সেইভাবে ম্যানেজারই ব্যবস্থা করে দিলো। মাথা পিছু ২৫০০ টাকা প্যাকেজে আমাদের উত্তর সিকিমে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো। সে দায়িত্ব নিয়ে আমাদের তার পরের দিন বেলা ১১টায় গাড়িতে তুলে দিলো। গ্যাংটক থেকে আমরা উত্তর সিকিমের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। এরপর আমরা যত এগোচ্ছি উত্তর সিকিমের দিকে ততই মনে শিহরণ জাগছিল, বিশেষ করে ঋষভের। হয়তো এর আগে আমরা এই রাস্তা দিয়ে ইয়ুংথাংগ গিয়েছি, কিন্তু কলকাতার কোলাহল মিশ্রিত মন এবং অবশ্যই দূষণ যুক্ত দৃষ্টি বারে বারে এই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। গোটা ব্যাপারটাই যেন কোলাহল মুক্ত। শুধু চোখ আর মনের অপার শান্তি। দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম মঙ্গনে। তার আগে অবশ্য আমরা ড্রাইভারের ঠিক করা একটি হোটেলে লাঞ্চটা সেড়ে ফেলেছিলাম। এরপর আমরা যাবার পথে ‘সেভেন সিস্টার’ জলপ্রপাত দেখলাম। ভয়ংকর সুন্দর এই জলপ্রপাতটি দেখে সকলে মোহিত হয়ে গেলাম। এই ফলসের কাছে গিয়ে আমরা যে যার মতো সুপার পোস দিয়ে ছবি তুলে নিলাম, আমিও এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে উপভোগ করে ছেলে ও ওয়াইফকে নিয়ে ক্যামেরা বন্দী করে নিলাম ।


বিকাল ঘনিয়ে সন্ধ্যে হয়ে এলো অথচ আমাদের গন্তব্য লাচুং তখনও অনেক দূরে । এর আগে যখন এসেছিলাম আমরা প্রায় সন্ধ্যের মুখে লাচুং এ পৌছে গিয়েছিলাম । কিন্তু এবার রাস্তা ভীষন খারাপ থাকায় এত সময় লাগলো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে জানালো লাচুং পৌছতে রাত ৮টা বেজে যাবে। উত্তর সিকিমে চুংথাং নামে একটি টাউন ছিলো। গ্যাংটক থেকে ৯৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর সিকিমের একটি জনপ্রিয় টাউন, যেখানে ইন্ডিয়াম আর্মির বেস ক্যাম্প আছে, আর বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আছে। সন্ধ্যে হওয়ার দরুন আমরা এই চুংথাং টাউন টিকে সেইভাবে দেখতে পেলাম না। উত্তর সিকিমের আরেকটি জনপ্রিয় টাউন মঙ্গনও খুব সুন্দর। এই পাহাড়ি টাউনটির চারিদিকে বিশাল জনবসতি ও দোকানপাটে ঘেরা। গতবারে এসে ছোট অথচ জনপ্রিয় এই টাউনটি দেখে দারুন আনন্দ পেয়েছিলাম। ভাবতে পারেনি যে এই দূর্গম পাহাড়ের মাঝে এত সুন্দর একটি টাউন থাকতে পারে। কিন্তু এবারে গিয়ে এই মঙ্গন-এর রুপ দেখে একেবারে মন খারাপ হয়ে গেল।  ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ এ এক বিদ্ধস্ত ভুমিকম্পে মঙ্গন পুরোপুরি ভাবে এলোমেলো। এখানে রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। সিকিম সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে উত্তর সিকিমকে আরো সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলার। এবং তাদের চেষ্টাও অনস্বীকার্য। দেখলাম তারা আবার মঙ্গনকে সাজিয়ে তুলছে আগের মতই। প্রায় ৬.৯ ম্যাগ্নিচুডে জোরালো ভুমিকম্পে মঙ্গন সহ উত্তর সিকিমের অন্যান্য জায়গায় যে প্রভাব পড়েছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমরা প্রায় ৭টার সময় চুংথাং এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই টের পাচ্ছিলাম যে এই পথ কত দূর্গম ! যাই হোক ঠিক রাত ৮ টার খানিক আগে ড্রাইভার লাচুংয়ে আমাদের একটি হোটেলের সামনে গাড়ি নিয়ে চলে এলো। বুঝে গেলাম আজকের রাতে আমাদের এইখানেই থাকতে হবে। রাত ১০ টা নাগাদ আমাদের ডিম-ভাত-সব্জি দিয়ে ডিনার খাওয়াতে বুঝে গেলাম গ্যাংটকের হোটেলের ম্যানেজার আমাদের কতখানি চুনা দিয়েছে । হোটেলের অবস্থা মোটামুটি মন্দের ভালো। ড্রাইভার সকলকে বলে গেলো ভোর ৬ টার সময় উঠতে হবে, সে আমাদের ইয়ুংথাম এ নিয়ে যাবে, তারপর মর্জি হলে জিরো পয়েন্ট । আসলে গ্যাংটকের ঐ হতচ্ছাড়া ম্যানেজারের প্যাকেজ এ জিরো পয়েন্ট ছিলো না ।

                ভোর ৬টার সময় আমরা ঘুম থেকে উঠে যে যার মত করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। ঋষভও দেখলাম বেশ উৎসাহ নিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। প্রায় ৪০ মিনিট পর আমরা ইয়ুংথাম চলে এলাম।  সেখানে গতবারে এসে আমরা দারুন মজা করেছিলাম, তাই এবারে এসে অতটা আগ্রহ দেখালাম না। আমাদের চোখ যে জিরো পয়েন্ট। ড্রাইভারকে বললাম আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি জিরো পয়েন্ট এ যেতে চাই। ওর সাথে মাথা পিছু ২০০০ টাকার রফা করে আমরা এগিয়ে চললাম জিরো পয়েন্টের দিকে। আমাদের চোখ সার্থক হবেই এই মনোভাবে একরাশ আনন্দ ও প্রত্যাশা নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম কাঙ্খিত জিরো পয়েন্টের দিকে। যেতে যেতে কত সুন্দর দৃশ্য আমাদের নজরে এলো যে অভিভূত শব্দও বুঝি তাতে কম হয়। গাড়ি থেকেই আমি অনেক দৃশ্য আমার মোবাইলের ক্যামেরায় নিয়ে নিলাম। আরো ৪০ মিনিট পর আমরা পৌছে গেলাম জিরো পয়েন্ট এ। গাড়ি থেকে নেমেই আমি প্রনাম জানালাম এই অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে। যে দিকে তাকাই শুধু সাদা চাদরে মোড়া বরফের সমাহার। ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করবো, কোথা থেকে শুরু করবো এই অনন্য সুন্দর শোভাকে নিজের মত করে উপভোগ করার, বেশ দ্বন্ধে পড়ে গেলাম। যেদিকে চাই, সেদিক টাকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। অনেক ছবি তুললাম মনের মত করে, তবুও যেন কম হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১০০র বেশি ছবি তুললাম, সেটাও যেন খুব নগণ্য। আমার ছেলে ঋষভ বরফ নিয়ে খেলা করতে লাগলো, ওর মাও ওর সাথে যোগ দিলো। ওরা ওদের মত করে এই সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করতে লাগল। তার ওপর সূর্যমামা আজ বড়ই প্রসন্ন, তার ছটা উঁচু হয়ে থাকা বরফে আবৃত শৃঙ্গ গুলোকে আর আলোকিত করে তুলেছিলো। সেই আলোর ছটায় আমরা আরও উদ্ভাসিত। আমি সেই মনোরম শোভাকে ক্যামেরা বন্দী করতে ভুল করলাম না। 


আমরা সবাই বিভিন্ন রকম পোস দিয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। আমি নিজেকে হিরো ভেবে পোস দিলাম আর আমার স্ত্রীকে বললাম ফটো তুলতে। তার ওপর বেশ কনকনে ঠান্ডা, আমি শুধু সোয়েটার পড়ে শাহরুখ খান স্টাইলে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। প্রায় দু'ঘন্টা আমরা সবাই বেশ মজা করলাম। ২ ঘণ্টা কাটিয়ে আমাদের মনে হলো যে সমস্ত পয়সা উসুল, আমাদের এখানে আসা সার্থক । গ্যাংটকের হোটেলের সেই বদ ম্যানেজারকে আর গালাগাল দিতে ইচ্ছা করলো না। কারণ আমাদের চোখে শুধু জিরো পয়েন্টের বিষ্ময়, শুধু তার শোভাই বিরাজ করছে চোখে ও মনে। ফেরার পথে আরো অনেক ছবি তুলে আমরা লাচুং-এ ফিরে এলাম। আবার সেই ডিম-ভাত-সব্জি দিয়ে লাঞ্চ করে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে ফিরে যাওয়ার পথ ধরলাম। ঐ পথ ধরে যখন ফিরছিলাম, ভয়ানক দূর্গম রাস্তা দেখে আমরা হতবাক। অথচ ড্রাইভার গতকাল রাতেই ঐ রাস্তা দিয়েই নিয়ে এসেছে। মনে মনে ড্রাইভারকে বাহবা দিলাম। চুংথাং টাউন দিয়ে যাবার সময় একটা মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলকে বেশ ব্যাথিত করে তুলল। জানতে পারলাম একটা মিলিটারি গাড়ি নাকি খাদে পড়ে গেছে। ঐ গাড়িতে ইন্ডিয়ান আর্মির প্রায় ১৬ জন জওয়ান ছিলো। ড্রাইভারই আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে খবর নিয়ে আমাদেরকে  জানালো। মঙ্গন হয়ে ফেরার সময় আবার ‘সেভেন সিস্টার’ ফলস দেখে ফেললাম। বিকাল হয়ে সন্ধ্যে চলে এলো। আমাদের গাড়ি গ্যাংটকের দিকে ছুটে চলেছে। গাড়িতে আমাদের সবাই ঘুমে কাতর। আমার চোখ দুটো একটু বুজতে চাইলো, কিন্তু জিরো পয়েন্টের সমস্ত সোন্দর্য্য সেটা হতে দিলো না। ক্লান্ত চোখেও আমি নিখাদ কোলাহল মুক্ত জিরো পয়েন্টের কথা ভেবে আমার মোবাইলের নোটপ্যাডে একটু কবি হওয়ার চেষ্টা করলাম ……… 

বরফের চাদর

কি অপূর্ব শোভা, তার কি মহিমা !!

সার্থক, আজ আমি করি তার বন্দনা … 

বরফের চাদরে মোড়া, হে অপরূপা

জিরো পয়েন্ট, সৃষ্টির অনন্য এক শিরোপা !

Friday, August 12, 2022

ভগবানের দূত

 

রাজকুমার ঘোষ
~ ১২.০৮.২০২২
জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা মাঝে মাঝেই স্মৃতির মধ্যে ভেসে ওঠে। সেই ভেসে যাওয়ার মধ্যে যদি গল্প থাকে অবশ্যই তা লিখে রাখা উচিত। এইরকমই একটি গল্প সকলের সাথে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হল। অনেক বছর আগে একটি ভিড় ট্রেনের গল্প মনে পড়ে গেল।
সদ্য কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছি। আর চাকরীর জন্য বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করতে শুরু করেছি। টেকনিক্যাল ফিল্ডের ছাত্র, কাজেই রেলের পরীক্ষা গুলোর জন্য আবেদন করতাম বেশি। রেলের টেকনিক্যাল ক্যাটেগরির জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন রেলবোর্ডের আন্ডারে পরীক্ষা গুলো নেওয়া হতো। সে এখনো হচ্ছে। আমাদের সময় পাটনা রেল বোর্ডের আন্ডারে আমি দুটো ক্যাটেগরীর জন্য আবেদন করেছিলাম। দুটো ক্ষেত্র থেকেই অ্যাডমিট কার্ড চলে আসে। কাজেই পরীক্ষা দিতে হলে পাটনা ও মুঙ্গের যেতে হবে। এই পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় আমাকে দূরপাল্লার ট্রেন গুলোর ওপর নির্ভর করতে হত। রিজার্ভেশনের তোয়াক্কা না করেই আমি জেনারেল কম্পার্টমেন্টেই জার্ণি করতাম। বেশ মনে আছে। পাটনায় পরীক্ষাটা দেওয়া হয়ে গেছে। পরের পরীক্ষা মুঙ্গেরে হবে। পাটনা স্টেশন থেকে টিকিট কেটে মুঙ্গেরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের ( নাম মনে নেই) জেনারেল কামরায় উঠে পড়েছি। ওঃ কি যে বিশ্রীরকম অবস্থা ! এমন ভিড় আমার ধারণার বাইরে। কোনরকম ঠেলা, গোত্তা সামলে কামরায় উঠেছি আর একটা না বসেও বসার মতো জায়গা পেয়েছি সেটাও খুব ভাগ্যের ব্যাপার। তারপর বেশ কিছু মহিলা তাদের কিছু ছাগল আর মুরগী নিয়ে কামরায় উঠেছে। অস্বাস্থ্যকর অবস্থা। ছাগল এবং মুরগীগুলোর সাথে একটা দুর্গন্ধ যেন পেটের ভেতরে থাকা খাবার গুলো নাড়িভুড়ি সমেত মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার মত অবস্থা। রীতিমত কোনঠাসা অবস্থা আমার। একটা সীটে আধবসা অবস্থায় বসে কামরায় উপস্থিত মানুষগুলোর থোবড়া গুলো আমি ফ্যালফ্যাল করে দেখছি আর ভাবছি কোথায় পৌছব আমরা! তার ওপর আপার বার্থে থাকা কিছু উটকো পাবলিক তাদের ঠ্যাঙ দুটো মুখের সামনে ঝুলিয়ে বসে আছে। এরই মধ্যে কামরায় উঠেছে বেশ কিছু হিজড়া। তারা এসেই হাতে তালি দিয়ে সকলের থেকে টাকা-পয়সা চাইছে। তাদের মধ্যে একজন এসে হাত বাড়িয়ে আমাকে বলল, "এ বাবুয়া"। আমি কথা না বাড়িয়ে বেশ ভয় পেয়ে পকেটে যা ছিল দিয়ে দিলাম। আমার পকেটে বোধ হয় কুড়ি কি পঞ্চাশ টাকার নোট ছিল। সেটাই চলে গেছে। আমি দেখিওনি। হিজড়াটি আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, "ভগবান তেরা ভালা করে"। এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল কিছু চ্যাংড়ামী করা বিহারী ছেলে। যাদের বলা যেতে পারে একটা গ্যাং। সেটা টের পেলাম ট্রেনে ওদের বাঁদরামী দেখে। কেন জানিনা আমাকে দেখে ওদের উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। আমার জামার পকেট ধরে ওরা টানাটানি করতে লাগল। ওদের মধ্যে একজন এসে আমাকে শাসিয়ে বলল,
-"ক্যায়া রে মনুয়া, বহুত দিলদার হে তু, কুছ তো হাম লোগোকে লিয়ে ভি রাখনা চাহিয়ে"।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কোনোরকমে মুখ দিয়ে বেরোলো,
- "ছোড় দো মুঝে। মেরে সাথ আচ্ছা নেহি কর রহে হো"।
- "ক্যায়া কর লেগা তু, মনুয়া। আগর আপনা ভালা চাতে হো, তো সবকুছ দে দো
এই বলে ওরা চারজন আমার কাছে এসে আমাকে উল্টোপাল্টা কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগল, আমার পকেট, লাগেজ দেখতে যাবে কি ! কোথা থেকে সেই হিজড়া এসে ওদের একজনকে সপাটে পেটে লাথি মারলো। ওদের আরো জনা-দশেক সাথী ছিল, তাদেরকেও সে ডেকে নিলো। তারপর রীতিমত ট্রেনে খন্ডযুদ্ধ। হিজড়াদের দাপটে ওই বাঁদরগুলো কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না। সেই হিজড়া যে আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছিল সে আমাকে আশ্বাস দিল, “এ বাবুয়া, ডরো মত, হাম সব পাশ হ্যায়, তু ভালা লেড়কা হ্যায়। হাম সব ভালাকে সাথ”। ওই সময় সত্যি ! আমার দু’চোখ বেয়ে জল চলে এলো । নিজের মনে মনে বললাম, ‘ভগবান, তুমি সত্যি, কতো রূপে আছো’ । ঘটনার পর আমি এতটাই অবাক হয়েছিলাম, যে না চাইলেও আমার ঘুম পাচ্ছিল। হিজড়া জানতে চাইল, কতদূর যাব আমি? আমি মুঙ্গেরে যাব জানাতে সে আশ্বস্ত করল তারাও যাবে বেগুসরাই। সুতরাং চিন্তা করতে মানা করল। আমাকে ভালো একটা বসার সিট পাইয়ে দিল এবং বলল, "শো যা বেটা"। আমি সত্যিই ঘুমিয়ে গেলাম সিটে বসে। ঠিক মুঙ্গের স্টেশনে আসার মিনিট পাঁচ আগে আমাকে ডেকে দিল, “বেটা উঠো, মুঙ্গের আগেয়ে” – আমি উঠে পড়লাম। তারপর স্টেশনে ট্রেন আসতেই ওরা আমার লাগেজ বের করে প্লাটফর্মে নামাল। আমাকে আশীর্বাদ করল। ট্রেন প্ল্যাটফর্ম থেকে চলে যাওয়ার আগে বলল, “টাটা বেটা”। আমি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইলাম। আর ভাবতে লাগলাম কিছুক্ষণ আগে ভিড় ট্রেনের ফেলে আসে মুহূর্তগুলো। যা আজও আমার স্মৃতিপটে একটি উজ্জ্বলপাতা হয়ে রয়ে আছে। মানবতার প্রতীক হিসাবে আমি সেই হিজড়াকে ভগবানের দূত বলতেও দু’বার ভাবিনা ।

Thursday, August 11, 2022

অচেনা শহর পাটনা


রাজকুমার ঘোষ 

# ১১-০৮-২০২২ 

জীবনের পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আজ রাখি পূর্ণিমার দিনে রাজীববাবু বাড়ির বারান্দায় বসে পঁয়ত্রিশ বছর আগের একটি সুখস্মৃতি ভাবছে, যা তাঁর মণিকোঠায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। তখন কাজের সূত্রে প্রথমবার তিনি পাটনা গেছেন। অচেনা শহর, কাউকেই চেনেন না। পাটনার সাউথ গান্ধী ময়দানের কাছে একটি হোটেলে ছিলেন। সেখান থেকে ভীষণ কাছেই একটি সংস্থার অফিসে ওনার কাছ ছিল। সেই অফিসের মেন বস আহমেদ আলীর সাথে রাজীব বাবুর পরিচয় হয়। প্রায় সপ্তাহখানেক পাটনায় থাকতে হবে এবং কাজগুলো সম্পূর্ণ করে তবেই বাড়ি ফিরতে পারবেন। যথেষ্ট চাপের কাজ। এছাড়া পাটনা শহর হিসাবে অশান্ত৷ রাজীব বাবুর কাছে পাটনা নাম শোনা মাত্রই ভীষণ অস্বস্তি। তবুও কাজের জন্যে আসতেই হল।  সেই সময় যখন তখন পাটনার রাস্তাঘাটে হত্যালীলা চলত, তার খবর নিউজ পেপারে হামেশাই প্রকাশিত হত। এমন একটি অশান্ত শহর পাটনায় রাজীব বাবুর দু'দিন কাটাতেই যেন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তার ওপর এক সপ্তাহ থাকতে হবে। কাজের ক্ষেত্র একজায়গায় নয়। বিভিন্ন শাখা অফিস যেমন, রাঁচি, হাতিয়া, মুজফফরপুর, হাজিপুর, মুঙ্গের, বেগুসরাই, নামকুম, টাটা প্রভৃতি জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হবে। সাথী হিসাবে থাকবেন আহমেদ আলী বা কখনো কখনো আহমেদ আলীর এক ঘনিষ্ট বন্ধু ঈদ্রিশ আলী। এই ঈদ্রিশ আলীর নিজস্ব একটি ব্যাটারী সেন্টার আছে। বেশ বড় বিজনেসম্যান। তারচেয়েও বড় কথা, ঈদ্রশ আলী এক বড়ধরণের গুণ্ডা। তার সাথে অনেক নেতা-পুলিশের চেনা জানা। কাউকে খুন করে লাশ গুম করে দেওয়া ঈদ্রিশের বাঁ হাতের খেল। ঈদ্রিশের এই ব্যাপারটা ওর সাথে প্রথম দর্শন বা ওপর ওপর মেলামেশা করলে কেউ বুঝতে পারবে না। রাজীব বাবু এমনিতে বেশ খোলামেলা এবং বন্ধু বৎসল। সকলের সাথে খুব সহজেই মিশে যান। প্রায় সপ্তাহ খানেক আহমেদ ও ঈদ্রিশের সাথে বিভিন্ন জায়গায় একসাথে ঘোরা, কাজ করা এবং অবশ্যই রাজীববাবুর ব্যবহারে ওরা দুই আলী ভীষণ মুগ্ধ। মাত্র কদিনেই রাজীববাবুকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো, প্রতিদিনের কাজের পরে টুকটাক আড্ডা, গল্প গুজবে সময় কাটানো সবই হয়েছে। ক'দিনেই এই অচেনা পাটনাতে রাজীববাবুর দু'জন বন্ধু জুটে গিয়েছিল। একদিন একটি বাঙালী হোটেলে লাঞ্চের সময় কথোপকথনে রাজীব বাবু জানতে পারলেন ঈদ্রিশের আসল পরিচয়,

হোটেলে রাজীব বাবু তিনটে মাছ-ভাত এর অর্ডার দিয়েছিলেন,

- দেখিয়ে আহমেদ ভাই, ঈদ্রিশ ভাই, আজ বাঙালী হোটেল মে বাঙালী খানা, মছলি-ভাত মেরে সাথ লাঞ্চ কর লিজিয়ে।

- আরে দাদা, হামলোগ কো আচ্ছা লাগতে হেয় ইয়ে মছলি ভাত। হামরা ভালো বাঙলা জানি রাজীবদা। বাঙলা ভাষা মিঠা আছে। আর বাঙালিদের সাথেই আমাদের কোম্পানির কাজ বেশি করতে হয়। এই কোম্পানির মালিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেকেই বাঙালি।

- বাহ শুনে খুব ভালো লাগল। আহমেদ ভাই। কদিনে আপনাদের সাথে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এবার পাটনা এলেই আপনাদের সাথে যোগাযোগ করব।

- একদম দাদা।

সেইসময় একজন ষণ্ডামার্কা লোক, ঈদ্রিশের কাছে এলো। কানে কানে কি যেন বলল, তারপর ঈদ্রিশ অর্ধেক খাওয়া ভাত-মাছ রেখে সেই লোকটার সাথে চলে যাওয়ার আগে রাজীববাবুকে বলল,

- দাদা প্লিজ। ডোন্ট মাইন্ড। একটো কাজ এসে গেছে, তুরন্ত যেতে হবে। ফির কভি।

অগত্যা রাজীব বাবু মেনে নিলেন। আহমেদ আলীর সাথে বসে লাঞ্চটা সেড়ে নিলেন। লাঞ্চ করতে করতেই আহমেদ আলী রাজীববাবুকে জানাল ঈদ্রিশের সম্বন্ধে। এখানকার নেতা-মন্ত্রী, পুলিশ কর্তাদের সাথে ঈদ্রিশের দারুণ কানেকশন। আহমেদ আলী জানায়, এই ঈদ্রিশের জন্যই সে পাটনায় আছে। ওর বাড়ি দেওঘরে। পাটনায় দারুণ ভাবে সেটল হয়ে থাকার জন্য একমাত্র ঈদ্রিশের অবদান। ঈদ্রিশ যেমন পরোপকারী, তেমনি বিপজ্জনক। ভালো মানুষের জন্য খুবই ভালো, খারাপ মানুষের জন্য খুবই খারাপ। এসব শুনে রাজীব বাবুর চক্ষু চড়কগাছ। আহমেদ আলী সেটা বুঝতে পেরে বলে,

- আরে রাজীবদা, আপনি ডরবেন না। আপনি ভীষণ ভালো মানুষ, মাই ডিয়ার লোক আছেন। ঈদ্রিশ আপনাকে খুব রেসপেক্ট করে।

পাঁচদিনের মাথায় রাজীববাবু রাঁচিতে কাজ করতে গেলেন। দুদিন ওখানে কাজ সেরে রাজীববাবু রাঁচি থেকে রাত ৮টার বাস ধরে পাটনায় ফিরে এলেন। বাস থেকে নামলেন রাত ১২টা ১০ মিনিটে। পাটনার সাউথ গান্ধী ময়দান সংলগ্ন সমস্ত রাস্তা শুনশান। অল্প রাস্তা পায়ে হেঁটে মাত্র ৩ মিনিট। ফাঁকা রাস্তা ধরে রাজীব বাবু পূর্ব পরিচিত হোটেলে ফিরে এলেন বটে, কিন্তু এই তিন মিনিটের মধ্যেই যেন ঘেমে অস্থির। হোটেলের রিসেপশনে যিনি ছিলেন,

- রাজীব স্যার আইয়ে আইয়ে ...

- হ্যাঁ, বহুত লেট হো গ্যায়া। রাত মে ইয়ে সাউথ গান্ধী ময়দান শুনশান। ডর গ্যায়া বহুত। প্লিজ রুম কি চাবি দি জিয়ে ভাই।

- জরুর। কুচ খানা আপকে লিয়ে...

- হুম ভুক তো লাগ রাহা হে। মেরে লিয়ে তিন রুটি, সবজি অর এক আণ্ডা ফ্রাই। কুছ রুপিয়া রাখ লিজিয়ে।

রাজীব বাবু প্যান্টের পেছন পকেটে হাত দিতে গিয়েই দেখে যে মানি ব্যাগ নেই। এই মানি ব্যাগেই তার সমস্ত টাকা ছিল। ভীষণ হতাশ হয়ে পড়লেন।

- ভাইয়া, বহুত বুড়া হুয়া মেরে সাথ। মেরা পার্স কোই উঠা লিয়া পকেট সে। সব রুপিয়া উসি মে থা। মেরা সমজমে কুছ নেহি আরা হে। ক্যায়া করু

- আপ শান্ত হো যাইয়ে পেহেলে। ঠান্ডে দিমাগ রাখিয়ে প্লিজ। পেহেলে আপ রুমে মে যাইয়ে। ম্যায় আপকে লিয়ে খানা ভেজতা হু।

- ঠিক হ্যায়। বহুত ট্যায়ার্ড হু। কাল শুভা কুছ করতা হু।

সেদিন কোনোরকমে কিছু মুখে দিয়ে রাজীব বাবু একরাশ মন খারাপ নিয়ে হোটেলের ঘরে ঘুমিয়ে গেলেন। উঠে পড়লেন খুব সকাল সকাল। উঠেই ছুটলেন আহমেদ আলীর সাথে দেখা করতে।

- আহমেদ ভাই, আমার সব টাকা পকেটমারী হয়ে গেছে।

- কি বলেন দাদা। এতো রুপিয়া পকেটে লিয়ে ঘুমবার কি দরকার ছিল। কুছ রুপিয়া আলাগ সে রাখতে পারতেন তো।

- জীবনে এই প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতা হল। কি করে জানবো, আমার সাথেই এমন হবে। আমি বাড়ি যেতে পারবো না, আপনারা সাহায্য না করলে। আর আমাকে আজই রাতের ট্রেন ধরতে হবে। কাল রাখী পূর্ণিমা আছে। বোন অপেক্ষা করবে। আমাকে রাখী না পরিয়ে সে কিন্তু খাবেই না। কি যে করি, মাথায় কিছু আসছে না আহমেদ ভাই।

- এতো তকলিফ নেবেন না দাদা ... প্লিজ। ঈদ্রিশ থাকতে আপনার চিন্তা কিসের...

একজনকে দিয়ে ঈদ্রিশের কাছে খবর পাঠাল আহমেদ। প্রায় দশ মিনিট পর ঈদ্রিশ হন্তদন্ত হয়ে চলে এল। এসেই রাজীববাবুকে জিজ্ঞেস করলেন,

- শুনলাম দাদা, আপ তকলিফ মে ...

- আরে দাদার পিক পকেট হো গ্যায়া। সব রুপিয়া গায়েব। - আহমেদ জানাল।

- হ্যাঁ ঈদ্রিশ ভাই, কাল রাঁচি থেকে পাটনায় ফেরার পথে আমার পকেট থেকে মানি ব্যাগ গুম হয়ে গেছে। আমার কাছে একরুপিয়াও নেই। আজ রাতে বাড়ি ফিরতেই হবে। কাল রাখী পূর্ণিমা মানে রক্ষা বন্ধন আছে। বোন অপেক্ষা করবে। ফেরার টিকিট মানি ব্যাগেই ছিল। কি হবে?

- আরে দাদা, এই ঈদ্রিশ ভাই আছে যখন, একদম টেনশন নেবেন না। আমার ভালো লাগবে আপনার মত ভালো মানুষের কাজে লাগতে পারলে। একদম টেনশন নেবেন না। পেহেলে আপনার জন্য টিকিট যোগাড় করি চলুন।

এই বলেই ঈদ্রিশ রাজীববাবুকে সাথে নিয়ে চললেন টিকিট বুকিং কাউন্টারে। সেখানে যে টিকিট কাটছিল সে জানাল, রিজার্ভেশন নেই, হবে না। ঈদ্রিশ আলী এরপর তার কানে কানে কি একটা বলল, তার কিছুক্ষণ পরেই লোকটা রাজীববাবুর থেকে ডিটেলস নিল, এবং একটা রিজার্ভেশন টিকিট রাজীববাবুর হাতে ধরিয়ে দিল। রাজীব বাবু কার্যত অবাক। এরপর সেখান থেকে রাজীববাবুকে নিয়ে ঈদ্রিশ আলী ফিরে এল হোটেলে। এসে হোটেলের সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিল। এরপর রাজীববাবুর হাতে বেশ কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

- আমি রাতে এসে আপনাকে স্টেশনে পৌঁছে দেব। আপনি রেডি থাকবেন।

- ঈদ্রিশ ভাই, থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনার এই উপকার একদম ভুলবো না। কিন্তু আপনার টাকা কিভাবে দেবো ...

- বোহিনের কাছে ভাইকে পাঠানোর দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন টাকার কথা না ভেবেই নিয়েছি দাদা। আমার বোন ছিল, সে এখন নেই। সে অনেক কথা। বলে আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না। পরে যখন সুযোগ হবে নিশ্চই জানাবো। আপনি সাবধানে বাড়ি ফিরে যান এটাই আমার চাওয়া।

- অবশ্যই কলকাতা আসবেন ঈদ্রিশ ভাই। খুব ভালো লাগল আপনাদের সাথে পেয়ে। আগামীদিনে হয়তো দেখা নাও হতে পারে, কিন্তু আমার বন্ধুর তালিকায় আপনি সারাজীবন থেকে গেলেন। আর রক্ষা বন্ধনের ভালোবাসা নেবেন আমার ও বোনের তরফ থেকে।

সেদিন কথা মতো ঈদ্রিশ ভাই রাজীব বাবুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। রাখী পূর্ণিমার দিনে সকালে বাড়িতে পৌঁছেই রাজীববাবু বাড়ির সবাইকে জানালেন সমস্ত ঘটনা। বোনকে বললেন, সেই মানুষটার কথা ভাব, তার উদ্দেশ্যেও একটা রাখী নিয়ে ভগবানের হাতে পড়িয়ে দিস বোন। শুধুমাত্র তার জন্যই আজ তোর দাদাকে তুই কাছে পেলি।

আজ পঁয়ত্রিশ বছর পরেও ট্রেন ছাড়বার মুহূর্তে ঈদ্রিশ আলীর সেই চোখ ছল ছল মুখ রাজীব বাবুর এখনও মনে আছে। না এরপর ঈদ্রিশ ভাই এর সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি রাজীববাবুর। তবে রাজীববাবু দায়িত্ব সহকারে ঈদ্রিশের ঠিকানায় একটি ব্যাঙ্ক ড্রাফট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মনে মনে রাজীব বাবু বললেন, "সেদিনের সেই অচেনা পাটনা শহরের পরিত্রাতা তুমি, ঈদ্রিশ ভাই। তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থাকো।"

Sunday, August 7, 2022

দিওয়ানা

 

দিওয়ানা
রাজকুমার ঘোষ 

অজয় স্বপ্নাকে প্রতিদিন দেখতে পেতো। ওর বাড়ির কাছেই স্বপ্নার বাড়ি, অথচ পরিচয় ছিল না। অজয়ের খুব ইচ্ছা স্বপ্নার সাথে কথা বলতে, কিন্তু সাহস করে কখনোই এগোতে পারে নি। কাজেই স্বপ্নাকে দেখা ছাড়া তার অন্য কোন উপায় ছিল না। রাস্তার ধারেই যখন স্বপ্নার বাড়ি, অজয় ওর বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় খুব চেষ্টা করত, যদি একটু তার ভালোলাগার মানুষটিকে দেখা যায়। সেই কবে থেকে স্বপ্নাকে দেখে যাচ্ছে, কিন্তু কথা হয়না, এমন কি স্বপ্না ওর দিকে তাকিয়েও দেখে না। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর এক কোচিং সেন্টারে অজয় স্বপ্নাকে দেখে একদম হকচকিয়ে যায় । সেদিনই স্বপ্নার সাথে প্রথম আলাপ এবং ওর স্বপ্নকন্যার নাম যে স্বপ্না সেটাও জানতে পারে। এরপর থেকে অজয়ের দিনগুলো বেশ ভালো ভাবে কাটতে থাকে, যাকে দেখার জন্য ও এত উদগ্রীব হয়ে থাকত, সে আজ ওর বেশ কাছের বন্ধু। অনেক গল্প হয়, কথা হয়। অজয়ের কাছে যেন সব কিছু স্বপ্ন বলে মনে হয়। অজয় তার সাধারণ জীবনে স্বপ্নার বন্ধুত্ব পেয়ে নিজেকে ভীষন ভাগ্যবান মনে করে। সে স্বপ্নাকে খুব ভালোবেসে ফেলে, কিন্তু সে কথা স্বপ্নাকে কখনোই জানাতে পারে না। ১৪ই জুন স্বপ্নার জন্মদিনে অজয় একটা উপহার নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিল। অজয় মনে মনে ঠিক করেছিল, "আজই আমার মনের মানুষকে মনের কথা বলেই ছাড়বো। ওর ভালোলাগার উপহার ওকে দিয়ে আমার মনে গোপন কথা উজার করে দেবো তোমাকে। স্বপ্না তুমি আমার স্বপ্নের স্বপ্না।"  উপহার হিসাবে অজয় নিয়ে গিয়েছিল স্বপ্নার ফেভারিট সোনু নিগমের একটি জনপ্রিয় মিউজিক অ্যালবাম ‘দিওয়ানা’। পুরো নতুন ডিভিডি প্যাক। বেশ দারুন হবে ব্যাপারটা, এই ভেবে সে স্বপ্নার কাছে গিয়েছিল, কিন্তু ও বলতে পারেনি, তবে ও স্বপ্নার বাড়িতে কম্পিউটারের মিউজিক প্লেয়ারে দিওয়ানার একটা গান স্বপ্নাকে শুনিয়েছিল... “দিল সে দিল তক, বাত পৌছি, মিলতে মিলতে সনম”। গানটা চলছিল যখন, অজয় মনের কথা বলার জন্য স্বপ্নার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল, বোধ হয় স্বপ্নাকে ও বোঝাতে পেরেছিল।
তারপর থেকে অজয় স্বপ্নার সাথে কথা বলতেও একটু অস্বস্তি বোধ করত। স্বপ্নার থেকে একটু দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করত। একদিন স্বপ্না অজয়কে বাড়িতে ডাকে। ... অজয় গিয়েছিল... স্বপ্না অজয়কে ওর ছাদের ঘরে ডেকে নিয়ে যায় তারপর অজয়ের হাতটি ওর ঠোঁটের স্পর্শে বুঝিয়ে দেয় ভালোবাসার উষ্মস্রোত বুঝি এবার ওর হৃদয় নদীর মাঝ বরাবর বয়ে যাবে। ওকে জড়িয়ে ধরে স্বপ্না বলে, ‘তুমি কি এইভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরতে পারো না’...
অনেক বছর হয়ে গেলো, হঠাৎ করে আজকের তারিখ ভাবতেই অজয় আরও উৎফুল্ল হয়ে পড়ল। হ্যাঁ, ১৪ই জুন, এই দিনেই তো স্বপ্নার জন্মদিন ছিল...অজয় সেই ‘১৪ই জুনে’র কথা মনে করছে। স্বপ্নার সেই বিগলিত দৃষ্টি আজও ওর স্মৃতিতে উদ্ভাসিত, একটা অক্সিজেনের যোগান দেয়। কিন্তু আজ স্বপ্না যে ওর পাশে নেই, সে যে অন্য কারোর ঘরণী, তাতেও নো প্রবলেম... অজয় ওর প্রিয় ছাদের ঘরে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই বিশেষ দিনের সুখস্মৃতির কথা ভেবে নিজেকে সুখী মনে করছে, কিভাবে যেন সেই সুখস্মৃতি আজও তার কাছে সুখস্বপ্ন হিসাবেই আছে। এরপর অজয় বাড়ির বাইরে গিয়ে একটা সুন্দর কেক ও বেশ কটা রঙীন মোমবাতি গোপনে কিনে নিয়ে চলে এল। রাত্রি এগারোটায় বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে যেতেই ও ছাদের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে মোমবাতিগুলো জ্বালিয়ে নিয়ে, ফেসবুকে ওর ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা স্বপ্নার প্রোফাইল থেকে একটি ছবি ডাউনলোড করে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফিট করে, এরপর নিজে কেক কেটে স্বপ্নার উদ্দেশ্যে, “শুভ জন্মদিন প্রিয়া... তুমি কাছে না থাকলেও আমি আছি ... আমি আছি আমার মত করে তোমার স্মৃতি সাথে নিয়ে। তুমি হারিয়ে যাওনি স্বপ্না, এখনো হৃদয়ের ছোট্ট প্রকোষ্ঠে তুমি উজ্জ্বল হয়ে আছো। খুব ভালো থাকো প্রিয় বন্ধু তুমি...” ল্যাপটপে চালানো স্বপ্নার সেই প্রিয় গানটি মুহুর্তটাকে আরও সুন্দর করে তুললো, “দিল সে দিল তক বাত পৌছি, মিলতে মিলতে সনম...”