Saturday, August 13, 2022

কোলাহল মুক্ত জিরো পয়েন্ট

 

~ রাজকুমার ঘোষ 


শহরের কোলাহলে জটিল জীবন কয়েক মণ ভার নিয়ে মানুষের জীবন দিশাহারা করে দিচ্ছে দিনের পর দিন। সেখান থেকে বেরোতে পারা সম্ভব তো নয়ই, বরং বরং দিন দিন এই ভার জেঁকে বসেছে। তবুও ইচ্ছা হয় সেই ভার থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে। সেই কারণেই বাঙালি মন চায় কোলাহল মুক্ত জীবন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। মাঝেই মাঝেই পাহাড়ের দিকে মন টানে। আর পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার মজাই আলাদা রকমের, সেটা যদি আবার সিকিমের মত পাহাড়ি রাজ্য হয়। ভাবা যায় গোটা রাজ্যটাই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত, যার রাজধানী গ্যাংটক হল তার মধ্যমণী । বেশ কয়েক বছর আগে আমরা দার্জিলিং-এ যাব বলে বেড়িয়েছিলাম, কিন্তু রাজনেতিক অস্থিরতার দরূণ আমরা সিকিমে চলে এসেছিলাম। তখন আমরা ছাঙ্গু, বাবাধাম, ইয়ুমথাংগ পর্যন্ত্যই আটকে গিয়েছিলাম, কিন্তু লোক মুখে শোনা জিরো পয়েন্টকে না দেখেই ফিরে আসতে হয়েছিলো। কাছে এসেও দেখতে না পেয়ে ভীষণ আক্ষেপ হয়েছিলো । মনের সেই ইচ্ছাটা ভাগ্যিস ধরে রেখেছিলাম । তাই গতবছর পূজোর পর টার্গেট করেই রেখেছিলাম যে আবার আমরা গ্যাংটক যাব, মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই জিরো পয়েন্ট ।   

          ইচ্ছা অনুযায়ী লক্ষী পুজোর ঠিক পরের দিনই আমরা দল বেধেঁ গ্যাংটক থুরি জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম । প্রায় ৮ জন নিয়ে আমাদের দল বেশ ভারী ছিলো । স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সবাই খোশমেজাজে। আমার হিরো মানে আমার ছেলে ঋষভ তো বেজায় খুশি। তার কাছে এই ঘুরতে যাওয়া এক বিরাট অনুভব, সে আমার কাছে সিকিম তথা গ্যাংটক এমনকি জিরো পয়েন্ট নিয়েও জেনে নিয়েছে ।

শিয়ালদাহ থেকে রাতের কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস ধরে আমরা সবাই গ্যাংটক পৌছে গেলাম পরের দিন সকালে, তারপর সেখান থেকে ট্রাভেলের গাড়িতে চেপে পাহাড়ী রাস্তার অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা বিকালে গ্যাংটক পৌঁছে গেলাম। সেদিনের মত বিশ্রাম নিয়ে তার পরের দিন থেকেই আমাদের চোখ থাকার স্বার্থকতাটা বুঝতে পারলাম। পরের দিন ছাঙ্গু ও বাবাধাম, তার পরের দিন পশ্চিম সিকিমের সান্ড্রাপ্সি, সাই বাবার মন্দির ও চারধাম দেখে আমরা সবাই অভিভূত। আমাদের খুব ইচ্ছা ছিলো যে ছাঙ্গু ও বাবাধামের বরফ পড়া দেখবো, কিন্তু বেশ হতাশ হয়েছিলাম। সেভাবে কিছুই দেখতে পেলাম না। যেদিন গিয়েছিলাম ঠিক তার পরের দিনই নাকি বরফ পড়েছে। হতাশ যেন আরো বেড়ে গেলো। বৃষ্টি পড়ায় নাকি ওখানে বরফ পড়েছে। তা আমরা গ্যাংটকের যে হোটেলে ছিলাম, সেখানকার ম্যানেজার বললো জিরো পয়েন্টে বরফ নাকি পাবোই, শুনে বেশ আনন্দ পেলাম। সেইভাবে ম্যানেজারই ব্যবস্থা করে দিলো। মাথা পিছু ২৫০০ টাকা প্যাকেজে আমাদের উত্তর সিকিমে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো। সে দায়িত্ব নিয়ে আমাদের তার পরের দিন বেলা ১১টায় গাড়িতে তুলে দিলো। গ্যাংটক থেকে আমরা উত্তর সিকিমের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। এরপর আমরা যত এগোচ্ছি উত্তর সিকিমের দিকে ততই মনে শিহরণ জাগছিল, বিশেষ করে ঋষভের। হয়তো এর আগে আমরা এই রাস্তা দিয়ে ইয়ুংথাংগ গিয়েছি, কিন্তু কলকাতার কোলাহল মিশ্রিত মন এবং অবশ্যই দূষণ যুক্ত দৃষ্টি বারে বারে এই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। গোটা ব্যাপারটাই যেন কোলাহল মুক্ত। শুধু চোখ আর মনের অপার শান্তি। দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম মঙ্গনে। তার আগে অবশ্য আমরা ড্রাইভারের ঠিক করা একটি হোটেলে লাঞ্চটা সেড়ে ফেলেছিলাম। এরপর আমরা যাবার পথে ‘সেভেন সিস্টার’ জলপ্রপাত দেখলাম। ভয়ংকর সুন্দর এই জলপ্রপাতটি দেখে সকলে মোহিত হয়ে গেলাম। এই ফলসের কাছে গিয়ে আমরা যে যার মতো সুপার পোস দিয়ে ছবি তুলে নিলাম, আমিও এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে উপভোগ করে ছেলে ও ওয়াইফকে নিয়ে ক্যামেরা বন্দী করে নিলাম ।


বিকাল ঘনিয়ে সন্ধ্যে হয়ে এলো অথচ আমাদের গন্তব্য লাচুং তখনও অনেক দূরে । এর আগে যখন এসেছিলাম আমরা প্রায় সন্ধ্যের মুখে লাচুং এ পৌছে গিয়েছিলাম । কিন্তু এবার রাস্তা ভীষন খারাপ থাকায় এত সময় লাগলো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে জানালো লাচুং পৌছতে রাত ৮টা বেজে যাবে। উত্তর সিকিমে চুংথাং নামে একটি টাউন ছিলো। গ্যাংটক থেকে ৯৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর সিকিমের একটি জনপ্রিয় টাউন, যেখানে ইন্ডিয়াম আর্মির বেস ক্যাম্প আছে, আর বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আছে। সন্ধ্যে হওয়ার দরুন আমরা এই চুংথাং টাউন টিকে সেইভাবে দেখতে পেলাম না। উত্তর সিকিমের আরেকটি জনপ্রিয় টাউন মঙ্গনও খুব সুন্দর। এই পাহাড়ি টাউনটির চারিদিকে বিশাল জনবসতি ও দোকানপাটে ঘেরা। গতবারে এসে ছোট অথচ জনপ্রিয় এই টাউনটি দেখে দারুন আনন্দ পেয়েছিলাম। ভাবতে পারেনি যে এই দূর্গম পাহাড়ের মাঝে এত সুন্দর একটি টাউন থাকতে পারে। কিন্তু এবারে গিয়ে এই মঙ্গন-এর রুপ দেখে একেবারে মন খারাপ হয়ে গেল।  ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ এ এক বিদ্ধস্ত ভুমিকম্পে মঙ্গন পুরোপুরি ভাবে এলোমেলো। এখানে রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। সিকিম সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে উত্তর সিকিমকে আরো সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলার। এবং তাদের চেষ্টাও অনস্বীকার্য। দেখলাম তারা আবার মঙ্গনকে সাজিয়ে তুলছে আগের মতই। প্রায় ৬.৯ ম্যাগ্নিচুডে জোরালো ভুমিকম্পে মঙ্গন সহ উত্তর সিকিমের অন্যান্য জায়গায় যে প্রভাব পড়েছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমরা প্রায় ৭টার সময় চুংথাং এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই টের পাচ্ছিলাম যে এই পথ কত দূর্গম ! যাই হোক ঠিক রাত ৮ টার খানিক আগে ড্রাইভার লাচুংয়ে আমাদের একটি হোটেলের সামনে গাড়ি নিয়ে চলে এলো। বুঝে গেলাম আজকের রাতে আমাদের এইখানেই থাকতে হবে। রাত ১০ টা নাগাদ আমাদের ডিম-ভাত-সব্জি দিয়ে ডিনার খাওয়াতে বুঝে গেলাম গ্যাংটকের হোটেলের ম্যানেজার আমাদের কতখানি চুনা দিয়েছে । হোটেলের অবস্থা মোটামুটি মন্দের ভালো। ড্রাইভার সকলকে বলে গেলো ভোর ৬ টার সময় উঠতে হবে, সে আমাদের ইয়ুংথাম এ নিয়ে যাবে, তারপর মর্জি হলে জিরো পয়েন্ট । আসলে গ্যাংটকের ঐ হতচ্ছাড়া ম্যানেজারের প্যাকেজ এ জিরো পয়েন্ট ছিলো না ।

                ভোর ৬টার সময় আমরা ঘুম থেকে উঠে যে যার মত করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। ঋষভও দেখলাম বেশ উৎসাহ নিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। প্রায় ৪০ মিনিট পর আমরা ইয়ুংথাম চলে এলাম।  সেখানে গতবারে এসে আমরা দারুন মজা করেছিলাম, তাই এবারে এসে অতটা আগ্রহ দেখালাম না। আমাদের চোখ যে জিরো পয়েন্ট। ড্রাইভারকে বললাম আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি জিরো পয়েন্ট এ যেতে চাই। ওর সাথে মাথা পিছু ২০০০ টাকার রফা করে আমরা এগিয়ে চললাম জিরো পয়েন্টের দিকে। আমাদের চোখ সার্থক হবেই এই মনোভাবে একরাশ আনন্দ ও প্রত্যাশা নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম কাঙ্খিত জিরো পয়েন্টের দিকে। যেতে যেতে কত সুন্দর দৃশ্য আমাদের নজরে এলো যে অভিভূত শব্দও বুঝি তাতে কম হয়। গাড়ি থেকেই আমি অনেক দৃশ্য আমার মোবাইলের ক্যামেরায় নিয়ে নিলাম। আরো ৪০ মিনিট পর আমরা পৌছে গেলাম জিরো পয়েন্ট এ। গাড়ি থেকে নেমেই আমি প্রনাম জানালাম এই অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে। যে দিকে তাকাই শুধু সাদা চাদরে মোড়া বরফের সমাহার। ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করবো, কোথা থেকে শুরু করবো এই অনন্য সুন্দর শোভাকে নিজের মত করে উপভোগ করার, বেশ দ্বন্ধে পড়ে গেলাম। যেদিকে চাই, সেদিক টাকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। অনেক ছবি তুললাম মনের মত করে, তবুও যেন কম হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১০০র বেশি ছবি তুললাম, সেটাও যেন খুব নগণ্য। আমার ছেলে ঋষভ বরফ নিয়ে খেলা করতে লাগলো, ওর মাও ওর সাথে যোগ দিলো। ওরা ওদের মত করে এই সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করতে লাগল। তার ওপর সূর্যমামা আজ বড়ই প্রসন্ন, তার ছটা উঁচু হয়ে থাকা বরফে আবৃত শৃঙ্গ গুলোকে আর আলোকিত করে তুলেছিলো। সেই আলোর ছটায় আমরা আরও উদ্ভাসিত। আমি সেই মনোরম শোভাকে ক্যামেরা বন্দী করতে ভুল করলাম না। 


আমরা সবাই বিভিন্ন রকম পোস দিয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। আমি নিজেকে হিরো ভেবে পোস দিলাম আর আমার স্ত্রীকে বললাম ফটো তুলতে। তার ওপর বেশ কনকনে ঠান্ডা, আমি শুধু সোয়েটার পড়ে শাহরুখ খান স্টাইলে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। প্রায় দু'ঘন্টা আমরা সবাই বেশ মজা করলাম। ২ ঘণ্টা কাটিয়ে আমাদের মনে হলো যে সমস্ত পয়সা উসুল, আমাদের এখানে আসা সার্থক । গ্যাংটকের হোটেলের সেই বদ ম্যানেজারকে আর গালাগাল দিতে ইচ্ছা করলো না। কারণ আমাদের চোখে শুধু জিরো পয়েন্টের বিষ্ময়, শুধু তার শোভাই বিরাজ করছে চোখে ও মনে। ফেরার পথে আরো অনেক ছবি তুলে আমরা লাচুং-এ ফিরে এলাম। আবার সেই ডিম-ভাত-সব্জি দিয়ে লাঞ্চ করে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে ফিরে যাওয়ার পথ ধরলাম। ঐ পথ ধরে যখন ফিরছিলাম, ভয়ানক দূর্গম রাস্তা দেখে আমরা হতবাক। অথচ ড্রাইভার গতকাল রাতেই ঐ রাস্তা দিয়েই নিয়ে এসেছে। মনে মনে ড্রাইভারকে বাহবা দিলাম। চুংথাং টাউন দিয়ে যাবার সময় একটা মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলকে বেশ ব্যাথিত করে তুলল। জানতে পারলাম একটা মিলিটারি গাড়ি নাকি খাদে পড়ে গেছে। ঐ গাড়িতে ইন্ডিয়ান আর্মির প্রায় ১৬ জন জওয়ান ছিলো। ড্রাইভারই আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে খবর নিয়ে আমাদেরকে  জানালো। মঙ্গন হয়ে ফেরার সময় আবার ‘সেভেন সিস্টার’ ফলস দেখে ফেললাম। বিকাল হয়ে সন্ধ্যে চলে এলো। আমাদের গাড়ি গ্যাংটকের দিকে ছুটে চলেছে। গাড়িতে আমাদের সবাই ঘুমে কাতর। আমার চোখ দুটো একটু বুজতে চাইলো, কিন্তু জিরো পয়েন্টের সমস্ত সোন্দর্য্য সেটা হতে দিলো না। ক্লান্ত চোখেও আমি নিখাদ কোলাহল মুক্ত জিরো পয়েন্টের কথা ভেবে আমার মোবাইলের নোটপ্যাডে একটু কবি হওয়ার চেষ্টা করলাম ……… 

বরফের চাদর

কি অপূর্ব শোভা, তার কি মহিমা !!

সার্থক, আজ আমি করি তার বন্দনা … 

বরফের চাদরে মোড়া, হে অপরূপা

জিরো পয়েন্ট, সৃষ্টির অনন্য এক শিরোপা !

Friday, August 12, 2022

ভগবানের দূত

 

রাজকুমার ঘোষ
~ ১২.০৮.২০২২
জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা মাঝে মাঝেই স্মৃতির মধ্যে ভেসে ওঠে। সেই ভেসে যাওয়ার মধ্যে যদি গল্প থাকে অবশ্যই তা লিখে রাখা উচিত। এইরকমই একটি গল্প সকলের সাথে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হল। অনেক বছর আগে একটি ভিড় ট্রেনের গল্প মনে পড়ে গেল।
সদ্য কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছি। আর চাকরীর জন্য বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করতে শুরু করেছি। টেকনিক্যাল ফিল্ডের ছাত্র, কাজেই রেলের পরীক্ষা গুলোর জন্য আবেদন করতাম বেশি। রেলের টেকনিক্যাল ক্যাটেগরির জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন রেলবোর্ডের আন্ডারে পরীক্ষা গুলো নেওয়া হতো। সে এখনো হচ্ছে। আমাদের সময় পাটনা রেল বোর্ডের আন্ডারে আমি দুটো ক্যাটেগরীর জন্য আবেদন করেছিলাম। দুটো ক্ষেত্র থেকেই অ্যাডমিট কার্ড চলে আসে। কাজেই পরীক্ষা দিতে হলে পাটনা ও মুঙ্গের যেতে হবে। এই পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় আমাকে দূরপাল্লার ট্রেন গুলোর ওপর নির্ভর করতে হত। রিজার্ভেশনের তোয়াক্কা না করেই আমি জেনারেল কম্পার্টমেন্টেই জার্ণি করতাম। বেশ মনে আছে। পাটনায় পরীক্ষাটা দেওয়া হয়ে গেছে। পরের পরীক্ষা মুঙ্গেরে হবে। পাটনা স্টেশন থেকে টিকিট কেটে মুঙ্গেরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের ( নাম মনে নেই) জেনারেল কামরায় উঠে পড়েছি। ওঃ কি যে বিশ্রীরকম অবস্থা ! এমন ভিড় আমার ধারণার বাইরে। কোনরকম ঠেলা, গোত্তা সামলে কামরায় উঠেছি আর একটা না বসেও বসার মতো জায়গা পেয়েছি সেটাও খুব ভাগ্যের ব্যাপার। তারপর বেশ কিছু মহিলা তাদের কিছু ছাগল আর মুরগী নিয়ে কামরায় উঠেছে। অস্বাস্থ্যকর অবস্থা। ছাগল এবং মুরগীগুলোর সাথে একটা দুর্গন্ধ যেন পেটের ভেতরে থাকা খাবার গুলো নাড়িভুড়ি সমেত মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার মত অবস্থা। রীতিমত কোনঠাসা অবস্থা আমার। একটা সীটে আধবসা অবস্থায় বসে কামরায় উপস্থিত মানুষগুলোর থোবড়া গুলো আমি ফ্যালফ্যাল করে দেখছি আর ভাবছি কোথায় পৌছব আমরা! তার ওপর আপার বার্থে থাকা কিছু উটকো পাবলিক তাদের ঠ্যাঙ দুটো মুখের সামনে ঝুলিয়ে বসে আছে। এরই মধ্যে কামরায় উঠেছে বেশ কিছু হিজড়া। তারা এসেই হাতে তালি দিয়ে সকলের থেকে টাকা-পয়সা চাইছে। তাদের মধ্যে একজন এসে হাত বাড়িয়ে আমাকে বলল, "এ বাবুয়া"। আমি কথা না বাড়িয়ে বেশ ভয় পেয়ে পকেটে যা ছিল দিয়ে দিলাম। আমার পকেটে বোধ হয় কুড়ি কি পঞ্চাশ টাকার নোট ছিল। সেটাই চলে গেছে। আমি দেখিওনি। হিজড়াটি আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, "ভগবান তেরা ভালা করে"। এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল কিছু চ্যাংড়ামী করা বিহারী ছেলে। যাদের বলা যেতে পারে একটা গ্যাং। সেটা টের পেলাম ট্রেনে ওদের বাঁদরামী দেখে। কেন জানিনা আমাকে দেখে ওদের উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। আমার জামার পকেট ধরে ওরা টানাটানি করতে লাগল। ওদের মধ্যে একজন এসে আমাকে শাসিয়ে বলল,
-"ক্যায়া রে মনুয়া, বহুত দিলদার হে তু, কুছ তো হাম লোগোকে লিয়ে ভি রাখনা চাহিয়ে"।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কোনোরকমে মুখ দিয়ে বেরোলো,
- "ছোড় দো মুঝে। মেরে সাথ আচ্ছা নেহি কর রহে হো"।
- "ক্যায়া কর লেগা তু, মনুয়া। আগর আপনা ভালা চাতে হো, তো সবকুছ দে দো
এই বলে ওরা চারজন আমার কাছে এসে আমাকে উল্টোপাল্টা কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগল, আমার পকেট, লাগেজ দেখতে যাবে কি ! কোথা থেকে সেই হিজড়া এসে ওদের একজনকে সপাটে পেটে লাথি মারলো। ওদের আরো জনা-দশেক সাথী ছিল, তাদেরকেও সে ডেকে নিলো। তারপর রীতিমত ট্রেনে খন্ডযুদ্ধ। হিজড়াদের দাপটে ওই বাঁদরগুলো কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না। সেই হিজড়া যে আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছিল সে আমাকে আশ্বাস দিল, “এ বাবুয়া, ডরো মত, হাম সব পাশ হ্যায়, তু ভালা লেড়কা হ্যায়। হাম সব ভালাকে সাথ”। ওই সময় সত্যি ! আমার দু’চোখ বেয়ে জল চলে এলো । নিজের মনে মনে বললাম, ‘ভগবান, তুমি সত্যি, কতো রূপে আছো’ । ঘটনার পর আমি এতটাই অবাক হয়েছিলাম, যে না চাইলেও আমার ঘুম পাচ্ছিল। হিজড়া জানতে চাইল, কতদূর যাব আমি? আমি মুঙ্গেরে যাব জানাতে সে আশ্বস্ত করল তারাও যাবে বেগুসরাই। সুতরাং চিন্তা করতে মানা করল। আমাকে ভালো একটা বসার সিট পাইয়ে দিল এবং বলল, "শো যা বেটা"। আমি সত্যিই ঘুমিয়ে গেলাম সিটে বসে। ঠিক মুঙ্গের স্টেশনে আসার মিনিট পাঁচ আগে আমাকে ডেকে দিল, “বেটা উঠো, মুঙ্গের আগেয়ে” – আমি উঠে পড়লাম। তারপর স্টেশনে ট্রেন আসতেই ওরা আমার লাগেজ বের করে প্লাটফর্মে নামাল। আমাকে আশীর্বাদ করল। ট্রেন প্ল্যাটফর্ম থেকে চলে যাওয়ার আগে বলল, “টাটা বেটা”। আমি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইলাম। আর ভাবতে লাগলাম কিছুক্ষণ আগে ভিড় ট্রেনের ফেলে আসে মুহূর্তগুলো। যা আজও আমার স্মৃতিপটে একটি উজ্জ্বলপাতা হয়ে রয়ে আছে। মানবতার প্রতীক হিসাবে আমি সেই হিজড়াকে ভগবানের দূত বলতেও দু’বার ভাবিনা ।

Thursday, August 11, 2022

অচেনা শহর পাটনা


রাজকুমার ঘোষ 

# ১১-০৮-২০২২ 

জীবনের পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আজ রাখি পূর্ণিমার দিনে রাজীববাবু বাড়ির বারান্দায় বসে পঁয়ত্রিশ বছর আগের একটি সুখস্মৃতি ভাবছে, যা তাঁর মণিকোঠায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। তখন কাজের সূত্রে প্রথমবার তিনি পাটনা গেছেন। অচেনা শহর, কাউকেই চেনেন না। পাটনার সাউথ গান্ধী ময়দানের কাছে একটি হোটেলে ছিলেন। সেখান থেকে ভীষণ কাছেই একটি সংস্থার অফিসে ওনার কাছ ছিল। সেই অফিসের মেন বস আহমেদ আলীর সাথে রাজীব বাবুর পরিচয় হয়। প্রায় সপ্তাহখানেক পাটনায় থাকতে হবে এবং কাজগুলো সম্পূর্ণ করে তবেই বাড়ি ফিরতে পারবেন। যথেষ্ট চাপের কাজ। এছাড়া পাটনা শহর হিসাবে অশান্ত৷ রাজীব বাবুর কাছে পাটনা নাম শোনা মাত্রই ভীষণ অস্বস্তি। তবুও কাজের জন্যে আসতেই হল।  সেই সময় যখন তখন পাটনার রাস্তাঘাটে হত্যালীলা চলত, তার খবর নিউজ পেপারে হামেশাই প্রকাশিত হত। এমন একটি অশান্ত শহর পাটনায় রাজীব বাবুর দু'দিন কাটাতেই যেন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তার ওপর এক সপ্তাহ থাকতে হবে। কাজের ক্ষেত্র একজায়গায় নয়। বিভিন্ন শাখা অফিস যেমন, রাঁচি, হাতিয়া, মুজফফরপুর, হাজিপুর, মুঙ্গের, বেগুসরাই, নামকুম, টাটা প্রভৃতি জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হবে। সাথী হিসাবে থাকবেন আহমেদ আলী বা কখনো কখনো আহমেদ আলীর এক ঘনিষ্ট বন্ধু ঈদ্রিশ আলী। এই ঈদ্রিশ আলীর নিজস্ব একটি ব্যাটারী সেন্টার আছে। বেশ বড় বিজনেসম্যান। তারচেয়েও বড় কথা, ঈদ্রশ আলী এক বড়ধরণের গুণ্ডা। তার সাথে অনেক নেতা-পুলিশের চেনা জানা। কাউকে খুন করে লাশ গুম করে দেওয়া ঈদ্রিশের বাঁ হাতের খেল। ঈদ্রিশের এই ব্যাপারটা ওর সাথে প্রথম দর্শন বা ওপর ওপর মেলামেশা করলে কেউ বুঝতে পারবে না। রাজীব বাবু এমনিতে বেশ খোলামেলা এবং বন্ধু বৎসল। সকলের সাথে খুব সহজেই মিশে যান। প্রায় সপ্তাহ খানেক আহমেদ ও ঈদ্রিশের সাথে বিভিন্ন জায়গায় একসাথে ঘোরা, কাজ করা এবং অবশ্যই রাজীববাবুর ব্যবহারে ওরা দুই আলী ভীষণ মুগ্ধ। মাত্র কদিনেই রাজীববাবুকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো, প্রতিদিনের কাজের পরে টুকটাক আড্ডা, গল্প গুজবে সময় কাটানো সবই হয়েছে। ক'দিনেই এই অচেনা পাটনাতে রাজীববাবুর দু'জন বন্ধু জুটে গিয়েছিল। একদিন একটি বাঙালী হোটেলে লাঞ্চের সময় কথোপকথনে রাজীব বাবু জানতে পারলেন ঈদ্রিশের আসল পরিচয়,

হোটেলে রাজীব বাবু তিনটে মাছ-ভাত এর অর্ডার দিয়েছিলেন,

- দেখিয়ে আহমেদ ভাই, ঈদ্রিশ ভাই, আজ বাঙালী হোটেল মে বাঙালী খানা, মছলি-ভাত মেরে সাথ লাঞ্চ কর লিজিয়ে।

- আরে দাদা, হামলোগ কো আচ্ছা লাগতে হেয় ইয়ে মছলি ভাত। হামরা ভালো বাঙলা জানি রাজীবদা। বাঙলা ভাষা মিঠা আছে। আর বাঙালিদের সাথেই আমাদের কোম্পানির কাজ বেশি করতে হয়। এই কোম্পানির মালিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেকেই বাঙালি।

- বাহ শুনে খুব ভালো লাগল। আহমেদ ভাই। কদিনে আপনাদের সাথে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এবার পাটনা এলেই আপনাদের সাথে যোগাযোগ করব।

- একদম দাদা।

সেইসময় একজন ষণ্ডামার্কা লোক, ঈদ্রিশের কাছে এলো। কানে কানে কি যেন বলল, তারপর ঈদ্রিশ অর্ধেক খাওয়া ভাত-মাছ রেখে সেই লোকটার সাথে চলে যাওয়ার আগে রাজীববাবুকে বলল,

- দাদা প্লিজ। ডোন্ট মাইন্ড। একটো কাজ এসে গেছে, তুরন্ত যেতে হবে। ফির কভি।

অগত্যা রাজীব বাবু মেনে নিলেন। আহমেদ আলীর সাথে বসে লাঞ্চটা সেড়ে নিলেন। লাঞ্চ করতে করতেই আহমেদ আলী রাজীববাবুকে জানাল ঈদ্রিশের সম্বন্ধে। এখানকার নেতা-মন্ত্রী, পুলিশ কর্তাদের সাথে ঈদ্রিশের দারুণ কানেকশন। আহমেদ আলী জানায়, এই ঈদ্রিশের জন্যই সে পাটনায় আছে। ওর বাড়ি দেওঘরে। পাটনায় দারুণ ভাবে সেটল হয়ে থাকার জন্য একমাত্র ঈদ্রিশের অবদান। ঈদ্রিশ যেমন পরোপকারী, তেমনি বিপজ্জনক। ভালো মানুষের জন্য খুবই ভালো, খারাপ মানুষের জন্য খুবই খারাপ। এসব শুনে রাজীব বাবুর চক্ষু চড়কগাছ। আহমেদ আলী সেটা বুঝতে পেরে বলে,

- আরে রাজীবদা, আপনি ডরবেন না। আপনি ভীষণ ভালো মানুষ, মাই ডিয়ার লোক আছেন। ঈদ্রিশ আপনাকে খুব রেসপেক্ট করে।

পাঁচদিনের মাথায় রাজীববাবু রাঁচিতে কাজ করতে গেলেন। দুদিন ওখানে কাজ সেরে রাজীববাবু রাঁচি থেকে রাত ৮টার বাস ধরে পাটনায় ফিরে এলেন। বাস থেকে নামলেন রাত ১২টা ১০ মিনিটে। পাটনার সাউথ গান্ধী ময়দান সংলগ্ন সমস্ত রাস্তা শুনশান। অল্প রাস্তা পায়ে হেঁটে মাত্র ৩ মিনিট। ফাঁকা রাস্তা ধরে রাজীব বাবু পূর্ব পরিচিত হোটেলে ফিরে এলেন বটে, কিন্তু এই তিন মিনিটের মধ্যেই যেন ঘেমে অস্থির। হোটেলের রিসেপশনে যিনি ছিলেন,

- রাজীব স্যার আইয়ে আইয়ে ...

- হ্যাঁ, বহুত লেট হো গ্যায়া। রাত মে ইয়ে সাউথ গান্ধী ময়দান শুনশান। ডর গ্যায়া বহুত। প্লিজ রুম কি চাবি দি জিয়ে ভাই।

- জরুর। কুচ খানা আপকে লিয়ে...

- হুম ভুক তো লাগ রাহা হে। মেরে লিয়ে তিন রুটি, সবজি অর এক আণ্ডা ফ্রাই। কুছ রুপিয়া রাখ লিজিয়ে।

রাজীব বাবু প্যান্টের পেছন পকেটে হাত দিতে গিয়েই দেখে যে মানি ব্যাগ নেই। এই মানি ব্যাগেই তার সমস্ত টাকা ছিল। ভীষণ হতাশ হয়ে পড়লেন।

- ভাইয়া, বহুত বুড়া হুয়া মেরে সাথ। মেরা পার্স কোই উঠা লিয়া পকেট সে। সব রুপিয়া উসি মে থা। মেরা সমজমে কুছ নেহি আরা হে। ক্যায়া করু

- আপ শান্ত হো যাইয়ে পেহেলে। ঠান্ডে দিমাগ রাখিয়ে প্লিজ। পেহেলে আপ রুমে মে যাইয়ে। ম্যায় আপকে লিয়ে খানা ভেজতা হু।

- ঠিক হ্যায়। বহুত ট্যায়ার্ড হু। কাল শুভা কুছ করতা হু।

সেদিন কোনোরকমে কিছু মুখে দিয়ে রাজীব বাবু একরাশ মন খারাপ নিয়ে হোটেলের ঘরে ঘুমিয়ে গেলেন। উঠে পড়লেন খুব সকাল সকাল। উঠেই ছুটলেন আহমেদ আলীর সাথে দেখা করতে।

- আহমেদ ভাই, আমার সব টাকা পকেটমারী হয়ে গেছে।

- কি বলেন দাদা। এতো রুপিয়া পকেটে লিয়ে ঘুমবার কি দরকার ছিল। কুছ রুপিয়া আলাগ সে রাখতে পারতেন তো।

- জীবনে এই প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতা হল। কি করে জানবো, আমার সাথেই এমন হবে। আমি বাড়ি যেতে পারবো না, আপনারা সাহায্য না করলে। আর আমাকে আজই রাতের ট্রেন ধরতে হবে। কাল রাখী পূর্ণিমা আছে। বোন অপেক্ষা করবে। আমাকে রাখী না পরিয়ে সে কিন্তু খাবেই না। কি যে করি, মাথায় কিছু আসছে না আহমেদ ভাই।

- এতো তকলিফ নেবেন না দাদা ... প্লিজ। ঈদ্রিশ থাকতে আপনার চিন্তা কিসের...

একজনকে দিয়ে ঈদ্রিশের কাছে খবর পাঠাল আহমেদ। প্রায় দশ মিনিট পর ঈদ্রিশ হন্তদন্ত হয়ে চলে এল। এসেই রাজীববাবুকে জিজ্ঞেস করলেন,

- শুনলাম দাদা, আপ তকলিফ মে ...

- আরে দাদার পিক পকেট হো গ্যায়া। সব রুপিয়া গায়েব। - আহমেদ জানাল।

- হ্যাঁ ঈদ্রিশ ভাই, কাল রাঁচি থেকে পাটনায় ফেরার পথে আমার পকেট থেকে মানি ব্যাগ গুম হয়ে গেছে। আমার কাছে একরুপিয়াও নেই। আজ রাতে বাড়ি ফিরতেই হবে। কাল রাখী পূর্ণিমা মানে রক্ষা বন্ধন আছে। বোন অপেক্ষা করবে। ফেরার টিকিট মানি ব্যাগেই ছিল। কি হবে?

- আরে দাদা, এই ঈদ্রিশ ভাই আছে যখন, একদম টেনশন নেবেন না। আমার ভালো লাগবে আপনার মত ভালো মানুষের কাজে লাগতে পারলে। একদম টেনশন নেবেন না। পেহেলে আপনার জন্য টিকিট যোগাড় করি চলুন।

এই বলেই ঈদ্রিশ রাজীববাবুকে সাথে নিয়ে চললেন টিকিট বুকিং কাউন্টারে। সেখানে যে টিকিট কাটছিল সে জানাল, রিজার্ভেশন নেই, হবে না। ঈদ্রিশ আলী এরপর তার কানে কানে কি একটা বলল, তার কিছুক্ষণ পরেই লোকটা রাজীববাবুর থেকে ডিটেলস নিল, এবং একটা রিজার্ভেশন টিকিট রাজীববাবুর হাতে ধরিয়ে দিল। রাজীব বাবু কার্যত অবাক। এরপর সেখান থেকে রাজীববাবুকে নিয়ে ঈদ্রিশ আলী ফিরে এল হোটেলে। এসে হোটেলের সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিল। এরপর রাজীববাবুর হাতে বেশ কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

- আমি রাতে এসে আপনাকে স্টেশনে পৌঁছে দেব। আপনি রেডি থাকবেন।

- ঈদ্রিশ ভাই, থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনার এই উপকার একদম ভুলবো না। কিন্তু আপনার টাকা কিভাবে দেবো ...

- বোহিনের কাছে ভাইকে পাঠানোর দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন টাকার কথা না ভেবেই নিয়েছি দাদা। আমার বোন ছিল, সে এখন নেই। সে অনেক কথা। বলে আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না। পরে যখন সুযোগ হবে নিশ্চই জানাবো। আপনি সাবধানে বাড়ি ফিরে যান এটাই আমার চাওয়া।

- অবশ্যই কলকাতা আসবেন ঈদ্রিশ ভাই। খুব ভালো লাগল আপনাদের সাথে পেয়ে। আগামীদিনে হয়তো দেখা নাও হতে পারে, কিন্তু আমার বন্ধুর তালিকায় আপনি সারাজীবন থেকে গেলেন। আর রক্ষা বন্ধনের ভালোবাসা নেবেন আমার ও বোনের তরফ থেকে।

সেদিন কথা মতো ঈদ্রিশ ভাই রাজীব বাবুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। রাখী পূর্ণিমার দিনে সকালে বাড়িতে পৌঁছেই রাজীববাবু বাড়ির সবাইকে জানালেন সমস্ত ঘটনা। বোনকে বললেন, সেই মানুষটার কথা ভাব, তার উদ্দেশ্যেও একটা রাখী নিয়ে ভগবানের হাতে পড়িয়ে দিস বোন। শুধুমাত্র তার জন্যই আজ তোর দাদাকে তুই কাছে পেলি।

আজ পঁয়ত্রিশ বছর পরেও ট্রেন ছাড়বার মুহূর্তে ঈদ্রিশ আলীর সেই চোখ ছল ছল মুখ রাজীব বাবুর এখনও মনে আছে। না এরপর ঈদ্রিশ ভাই এর সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি রাজীববাবুর। তবে রাজীববাবু দায়িত্ব সহকারে ঈদ্রিশের ঠিকানায় একটি ব্যাঙ্ক ড্রাফট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মনে মনে রাজীব বাবু বললেন, "সেদিনের সেই অচেনা পাটনা শহরের পরিত্রাতা তুমি, ঈদ্রিশ ভাই। তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থাকো।"

Sunday, August 7, 2022

দিওয়ানা

 

দিওয়ানা
রাজকুমার ঘোষ 

অজয় স্বপ্নাকে প্রতিদিন দেখতে পেতো। ওর বাড়ির কাছেই স্বপ্নার বাড়ি, অথচ পরিচয় ছিল না। অজয়ের খুব ইচ্ছা স্বপ্নার সাথে কথা বলতে, কিন্তু সাহস করে কখনোই এগোতে পারে নি। কাজেই স্বপ্নাকে দেখা ছাড়া তার অন্য কোন উপায় ছিল না। রাস্তার ধারেই যখন স্বপ্নার বাড়ি, অজয় ওর বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় খুব চেষ্টা করত, যদি একটু তার ভালোলাগার মানুষটিকে দেখা যায়। সেই কবে থেকে স্বপ্নাকে দেখে যাচ্ছে, কিন্তু কথা হয়না, এমন কি স্বপ্না ওর দিকে তাকিয়েও দেখে না। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর এক কোচিং সেন্টারে অজয় স্বপ্নাকে দেখে একদম হকচকিয়ে যায় । সেদিনই স্বপ্নার সাথে প্রথম আলাপ এবং ওর স্বপ্নকন্যার নাম যে স্বপ্না সেটাও জানতে পারে। এরপর থেকে অজয়ের দিনগুলো বেশ ভালো ভাবে কাটতে থাকে, যাকে দেখার জন্য ও এত উদগ্রীব হয়ে থাকত, সে আজ ওর বেশ কাছের বন্ধু। অনেক গল্প হয়, কথা হয়। অজয়ের কাছে যেন সব কিছু স্বপ্ন বলে মনে হয়। অজয় তার সাধারণ জীবনে স্বপ্নার বন্ধুত্ব পেয়ে নিজেকে ভীষন ভাগ্যবান মনে করে। সে স্বপ্নাকে খুব ভালোবেসে ফেলে, কিন্তু সে কথা স্বপ্নাকে কখনোই জানাতে পারে না। ১৪ই জুন স্বপ্নার জন্মদিনে অজয় একটা উপহার নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিল। অজয় মনে মনে ঠিক করেছিল, "আজই আমার মনের মানুষকে মনের কথা বলেই ছাড়বো। ওর ভালোলাগার উপহার ওকে দিয়ে আমার মনে গোপন কথা উজার করে দেবো তোমাকে। স্বপ্না তুমি আমার স্বপ্নের স্বপ্না।"  উপহার হিসাবে অজয় নিয়ে গিয়েছিল স্বপ্নার ফেভারিট সোনু নিগমের একটি জনপ্রিয় মিউজিক অ্যালবাম ‘দিওয়ানা’। পুরো নতুন ডিভিডি প্যাক। বেশ দারুন হবে ব্যাপারটা, এই ভেবে সে স্বপ্নার কাছে গিয়েছিল, কিন্তু ও বলতে পারেনি, তবে ও স্বপ্নার বাড়িতে কম্পিউটারের মিউজিক প্লেয়ারে দিওয়ানার একটা গান স্বপ্নাকে শুনিয়েছিল... “দিল সে দিল তক, বাত পৌছি, মিলতে মিলতে সনম”। গানটা চলছিল যখন, অজয় মনের কথা বলার জন্য স্বপ্নার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল, বোধ হয় স্বপ্নাকে ও বোঝাতে পেরেছিল।
তারপর থেকে অজয় স্বপ্নার সাথে কথা বলতেও একটু অস্বস্তি বোধ করত। স্বপ্নার থেকে একটু দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করত। একদিন স্বপ্না অজয়কে বাড়িতে ডাকে। ... অজয় গিয়েছিল... স্বপ্না অজয়কে ওর ছাদের ঘরে ডেকে নিয়ে যায় তারপর অজয়ের হাতটি ওর ঠোঁটের স্পর্শে বুঝিয়ে দেয় ভালোবাসার উষ্মস্রোত বুঝি এবার ওর হৃদয় নদীর মাঝ বরাবর বয়ে যাবে। ওকে জড়িয়ে ধরে স্বপ্না বলে, ‘তুমি কি এইভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরতে পারো না’...
অনেক বছর হয়ে গেলো, হঠাৎ করে আজকের তারিখ ভাবতেই অজয় আরও উৎফুল্ল হয়ে পড়ল। হ্যাঁ, ১৪ই জুন, এই দিনেই তো স্বপ্নার জন্মদিন ছিল...অজয় সেই ‘১৪ই জুনে’র কথা মনে করছে। স্বপ্নার সেই বিগলিত দৃষ্টি আজও ওর স্মৃতিতে উদ্ভাসিত, একটা অক্সিজেনের যোগান দেয়। কিন্তু আজ স্বপ্না যে ওর পাশে নেই, সে যে অন্য কারোর ঘরণী, তাতেও নো প্রবলেম... অজয় ওর প্রিয় ছাদের ঘরে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই বিশেষ দিনের সুখস্মৃতির কথা ভেবে নিজেকে সুখী মনে করছে, কিভাবে যেন সেই সুখস্মৃতি আজও তার কাছে সুখস্বপ্ন হিসাবেই আছে। এরপর অজয় বাড়ির বাইরে গিয়ে একটা সুন্দর কেক ও বেশ কটা রঙীন মোমবাতি গোপনে কিনে নিয়ে চলে এল। রাত্রি এগারোটায় বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে যেতেই ও ছাদের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে মোমবাতিগুলো জ্বালিয়ে নিয়ে, ফেসবুকে ওর ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা স্বপ্নার প্রোফাইল থেকে একটি ছবি ডাউনলোড করে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফিট করে, এরপর নিজে কেক কেটে স্বপ্নার উদ্দেশ্যে, “শুভ জন্মদিন প্রিয়া... তুমি কাছে না থাকলেও আমি আছি ... আমি আছি আমার মত করে তোমার স্মৃতি সাথে নিয়ে। তুমি হারিয়ে যাওনি স্বপ্না, এখনো হৃদয়ের ছোট্ট প্রকোষ্ঠে তুমি উজ্জ্বল হয়ে আছো। খুব ভালো থাকো প্রিয় বন্ধু তুমি...” ল্যাপটপে চালানো স্বপ্নার সেই প্রিয় গানটি মুহুর্তটাকে আরও সুন্দর করে তুললো, “দিল সে দিল তক বাত পৌছি, মিলতে মিলতে সনম...”



Friday, August 5, 2022

আমার আমি - ১ম ভাগ


 - রাজকুমার ঘোষ - ৩.৮.২০২২ 


"আমার...র আমি  

সবচেয়ে দামী"  


সত্যি কি দামী? কি জানি বুঝতে পারি না। 

- কিরে রাজ? তোর নতুন লেখা দেখতে পেলাম না। 

- এইতো লিখেছি। দেবো ফেসবুকে বা ব্লগ বা প্রতিলিপি অ্যাপসে। 


তাহলে আমি লিখলাম। আমার লেখা কতটা গ্রহণযোগ্য পাঠকের কাছে সেটা আমার আমিত্ব দিয়ে বোঝানো সম্ভব না। সাথে পাঠক আমাকে দরজায় টোকা দেবে আমার আমিত্বকে জাগাবে। তবেই আমার আমিকে বিকশিত করতে পারব। 


- কিরে বাবা, তুই সারাক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে লিখেই যাবি? 

- হ্যাঁ মা। এই হয়ে গেছে। আমি এক্ষুণি খেয়ে নিচ্ছি। 


আমার আমিত্ব চুপচাপ বসে ছিল কম্পিউটারের সামনে বসে। নতুন লেখায় মগ্ন ছিল। খাবার কথাই ভুলে গেছে। কিন্তু মমতাময়ী মা মনে করিয়ে দিল আমার আমি মায়ের আদরের সন্তান। তার মমতার আঁচলে নিজেকে গড়ে তুলেছি। সে ছিল বলেই আমি নিজেকে চিনতে পারছি বেশি করে। গর্ভধারিনী মা'র সন্তান একজন আমি। তাকে ছাড়া আমার আমিত্ব সম্পূর্ণ হয় না। 


শৈশব থেকে কিশোর, যৌবন হয়ে বার্ধক্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমি আমার আমিত্ব নিয়ে বড় বেশী চিন্তায়। আমার আমিত্ব কি অন্ধকারে না আলোকে ? এই নিয়েই চলতে থাকুক আমার ভাবনা আর ভাবনার বিকশিত হোক আমার লেখা। যদি পাঠকেরা সঙ্গ দেয়। তাহলে আমার আমিত্বকে তাদের পড়া ও বোঝার মাধ্যমে বুঝতে পারব। 


পাঠক ও লেখক-কবি বন্ধুরা আপনাদের মতামতের ওপর নির্ভর করছে "আমার আমি" কে কতখানি স্রোতের অনুকুলে বইতে পারব। না প্রতিকুল না। কারণ আমি যেমন তোমাদের ভালোবাসি, আমার বিশ্বাস তোমরাও আমাকে ভালোবাসো...নিউটনের তৃতীয় সূত্রের অনুকরণে... 


পরের পর্ব না হয় ভাবা যাবে... যাবার আগে আমার একটি পুরনো 'আমি' কে সকলের সাথে ভাগ করে নিলাম - 


"আমি" 


তখন,

আমি মুক্ত, আমি চঞ্চল…

খুঁজেছি মায়ের আঁচল।

ছিল না কোনো চাপ বা অনুতাপ …

থেকেছি বাবার ভয়ে চুপচাপ।

আমি দুরন্ত, আমি উন্মাদ…

তবুও দাদু-ঠাম্মার সোনার চাঁদ।


মাঝে,

আমি প্রতিবাদী, আমি অশান্ত…

বন্ধুরা বলেছে আমি নাকি ক্লান্ত।

ছিল বিবেক বোধ, খানিকটা মেধাবী…

শিক্ষকের চোখে হয়েছি বেহিসাবি।

আমি বাচাল, আমি সাধারণ …

তবুও তার হৃদয়ের অবলম্বন।


এখন,

আমি ধীর, আমি নিশ্চুপ…

ছাত্র-ছাত্রী'র মনে বিরূপ।

কখনো কবি, কখনো বা লেখক…

পাঠকের মনেতে হইনি সাবালক।

আমি মেজাজী, আমি দিই কষ্ট …

তবুও ছেলের চোখে সর্বশ্রেষ্ঠ।

Monday, August 1, 2022

পথের শেষ নেই...



রাজকুমার ঘোষ

       গত কয়েকদিন ধরে অফিসে ভীষণ কাজের চাপ, আজও তার ব্যতিক্রম নয় । অফিসের ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম । রাত ১১টা বেজে ১৫ মিনিট । তড়িঘড়ি অফিসের ফিফ্থ ফ্লোর থেকে নেমে চলে এলাম রাস্তার মোড়ে । বেশ নির্জন হয়ে গেছে রাস্তাটা । এই সময় বাস পাওয়া তো দুরের কথা, ট্যাক্সি পাবো কিনা সন্দেহ । রাস্তার উত্তর দিক ধরে সোজা হাঁটতে লাগলাম । খানিকটা যাবার পর দেখলাম অনেক দূর থেকে একটা গাড়ির আলোর ছটা ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে আমার দিকে । মনে বেশ বল পেলাম । যাই হোক দুশ্চিন্তা কাটলো তাহলে, হ্যাঁ একটা ট্যাক্সি আসছে, আমি সাথে সাথেই হাত নাড়িয়ে ট্যাক্সিটিকে দাঁড় করালাম । প্রায় অফিসের সামনে থেকেই ট্যাক্সিটা পেয়ে যেতে নিজেকে একটু ভাগ্যবান মনে করলাম । সারাদিন কাজ করে বেশ ক্লান্ত, তাই ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারকে গন্তব্যস্থল জানিয়ে সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম । অনেক রাত হয়ে গেছে, বাড়িতে সবাই চিন্তা করবে এই ভাবতে ভাবতে কখন চোখের কোনে ঘুম চলে এলো । জানিনা কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাৎ কি একটা আওয়াজে আমার ঘুমটা ভেঙে গেলো । একটু তাকিয়ে দেখলাম সবদিক, তারপর ড্রাইভারের সিটের পেছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা চোখে পড়তেই আমি চমকে উঠলাম । ভারী বিদঘুটে নাম্বার, চারটে শূণ্য । তার ঠিকপরেই লেখা আছে ‘পথের শেষ নেই’ । আমি খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম, তার সাথে ট্যাক্সিটিও প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে চলেছে । কোথায় যে থামবে জানি না । বেশ ভয় পেয়ে গেলাম আর ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আরে কোথায় যাচ্ছেন? ও মশাই, আর কত দূর ? বলা মাত্রই ড্রাইভার মুখ ঘোরালো, দেখেই চমকে গেলাম একটা কঙ্কাল … তারপর অদৃশ্য,  দেখলাম ড্রাইভারের সিটে কেউ নেই । আতঙ্কে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চোখ বুজে চেল্লাতে লাগলাম ।

      চোখ খুলতেই দেখি আমার সামনে বাবা, মা, বোন, ভাই দাঁড়িয়ে আছে । মা আমাকে জিজ্ঞসা করলেন, ‘কি হয়েছে সন্তু, ঘুমের ঘোরে চেল্লাচ্ছিস কেন ? কি হয়েছে তোর ?”… আমি সবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, তারপর পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম ।


স্বর্গরাজ্যে ফেলুদা


রাজকুমার ঘোষ 

ফেলু মিত্তিরের কেমন একটা যেন মনে হলো। বেশ একটা ঘুমের ঘোরে ছিলেন। হঠাৎ করেই ভেঙে গেলো। কিন্তু চোখের সামনে এতো মেঘ, মানে এই মেঘ যে সে মেঘ নয়। সোনার মেঘ। তাঁর সারা শরীর জুড়ে মেঘের কেমন একটা মায়া মায়া স্পর্শ। বেশ একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি মনে হচ্ছে তাঁর। আশে পাশে কেউ নজরে এলো না। ফেলুদা এগিয়ে চললেন। কোনো দিক নির্দেশ নেই, মনে হচ্ছে তাঁর পা তাকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার মন তাকে বাধাও দিচ্ছে না। সবই কেমন যেন একটা ভালো লাগার ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই কি একটা কোলাহলের শব্দ শুনতে পেলেন ফেলুদা। খুব খুব চেনা চেনা কন্ঠস্বর। দীর্ঘদিন পর আর একটি পরিচিত গলা ফেলুদার নাম করে ডাকছে।    

"ও মশাই, ও মশাই ... আরে এদিকে আসুন, এদিকে..." ফেলুদা এই গলার আওয়াজে বেশ বিভ্রান্ত হয়ে গেলো। এতো তাঁরই সফর সঙ্গী তথা রহস্যভেদের সঙ্গী লালমোহনবাবু। অনেকদিন পর গলাটা শুনে কি ভালো লাগছে ফেলুদার। ফেলুদা গলাটা শুনেই চলে এলেন সেখানে - তারপর                       
জটায়ুঃ হুররে, স্বর্গরাজ্য অপরাধমুক্ত করার আসল মানুষ এসে গেছেন৷
ফেলুদাঃ কি বলছেন লালমোহনবাবু ? এখানেও অপরাধ ! বলেন কি...
জটায়ুঃ হাইলি সাসপিসিয়াস (মগনলালের উদ্দেশ্যে)... ব্যাপারটা ভালো মনে হচ্ছে না ।
ফেলুদাঃ কেন কি হলো আবার ?
কিছুদূরে মগনলাল বসে ছিলেন। কিছুটা আন্দাজ করলেন -
মগনলালঃ আর বলেন না ফেলু মিত্তির৷ বেনারসে সেই যে ঘটনা হয়েছিল, সেই ট্রমা থেকে এখনো বেরোতে পারেননি আঙ্কেল। যাই হোক, ওয়েলকাম, ফেলু মিত্তির। মর্ত্যে আমার অনেক সাগরেদ ছিল, আপনি তাই শত্রু ছিলেন৷ কিন্তু এখানে আপনি আমার বন্ধু আছেন। আর এখানে ক্রাইম করার জায়গা নেই। ইন্দ্রদেব একাই সেই দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন। আর এখানে কেউ দোস্ত হতে চাইছে না আমার সাথে। একা একা হয়ে যাচ্ছি। আশা করি, এবার থেকে আর বোর হবোনা সিওর।
জটায়ুঃ ওর একটা কথাও বিশ্বাস করবেন না। দেখেছিলেন তো, আমার কি অবস্থা করেছিল। ওকে দেখলেই আমার কেমন মাথা ভন ভন করে ঘুরতে থাকে।
মগনলালঃ ছাড়েন ছাড়েন ওর কথা। আসুন এখানে একটু দাবার চাল হয়ে যাক। ও আঙ্কেল ভিতুর ডিম আছে। কতবার বললাম, আসুন একটু দাবার চাল শিখিয়ে দিই। কে শোনে কার কথা। আমাকে এখনও ভিলেন ভাবে।
জটায়ুঃ ভিলেন শুধু, ভেরি সাসপিসিয়াস। চোখ খানা দেখছেন, ফেলুবাবু। কেমন লাল আর ভয়ংকর।
ফেলুদাঃ আরে আমি আছি তো লালমোহনবাবু।
জটায়ুঃ একদমই তাই। আপনি এসে পড়েছেন আমার আর চিন্তা নেই। এতদিন যে কিভাবে ছিলাম আমি। এখানে সবকিছু শান্ত, নতুন কোনো প্লটও আসছে না। ভাবলাম 'স্বর্গরাজ্যে হানাদার' নামে একটা দুর্দান্ত ক্রাইম থ্রিলার লিখব। প্রখর রুদ্র তার শক্তি আর বুদ্ধির জোরে সব কিছু সমাধান করে দেবে। কিন্তু এখানে তো সবই সুন্দর। আপনিও নেই। সবাই কি ভালো। এই মগনলাল এসেই আমার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
মগনলালঃ হা হা হা হা ... ডরপুক আঙ্কেল। ভাগো ইয়াসে। আসুন ফেলুবাবু, হয়ে যাক তবে, একটু দাবা খেলি।
ফেলুদাঃ নিশ্চয়ই৷ তবে তার আগে আমার আসল তিন বন্ধুর সাথে একটু দেখা করি। আমি ওদের শ্যাম যে। কতদিন যে বসন্ত বিলাপের সামনে আড্ডা দিইনি। হ্যাঁ ওদের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। আমার তিন প্রিয় বন্ধু - নাটা করে গুপ্ত (ফেলুদা ডেকে নিলো, সাথে আরও দুজনকে)। প্যাংলা চেহারার সিধু আর লালু।   
গুপ্তঃ এইতো আমাদের পেছনে তুইও এসেছিস শ্যাম। হুররে। আজ আমরা মই নিয়ে তৈরী হচ্ছিলাম, এখানে অপ্সরাদের গেস্ট হাউসে হানা দেবো। তোকেও পেয়ে গেলাম। অপ্সরাদের নাচের বারোটা বাজাবো৷ জানিস, আমাদের হ্যাটা করেছে। আমাকে আর সিধুকে বলেছে কিনা 'লরেল হার্ডি' ।   
সিধুঃ দেড় বছর হলো আমি এখানে এসেছি শ্যাম। এখানে থেকে কেমন দেখতে হয়েছে রে আমাকে।
লালুঃ আহা! উত্তমকুমারের মত, একটা অপ্সরাও যদি তোর এই প্যাকাটির মত চেহারার দিকে তাকাতো। 😆😆
সিধুঃ ঠিক হবে না বলছি লালু। তোকে ধরে কেটে ফেলবো। 😡😡 জানিস শ্যাম, আমি এখানে একটা অপ্সরাকে পটিয়েও ফেলেছিলাম, মাঝখান থেকে এই লালু সব গুবলেট করে দিলো।
ফেলুদা চলে এলেন শ্যামের আদলে ...
শ্যামঃ আচ্ছা ঠিক আছে। ঠিক আছে। তোরা সেই এক রয়ে গেলি। চেঞ্জ আর হলি না।
লালুঃ তোর সাথে এরা কে শ্যাম? সামনে এই টাকলাটা আর ওখানে বাবুর মতো বসে থাকা মালটা?
শ্যামঃ চুপ কর। ইনি (জটায়ুকে দেখিয়ে) লালমোহনবাবু।
জটায়ুঃ (ফেলুদাকে থামিয়ে, গদ্গদ হয়ে) আমি হলাম জটায়ু, লালমোহন গাঙ্গুলি। আমার অনেকগুলো বিখ্যাত রহস্য উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। প্রখর রুদ্রের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই।
গুপ্তঃ কি ক্ষুদ্র?
জটায়ুঃ (ঘাবড়ে গিয়ে) কি বলছেন? আপনি প্রখর রুদ্রের নাম শোনেননি?
গুপ্তঃ দূর মশাই, শুনেছি শুনেছি। আমিও তো লিখেছিলাম প্রখর রুদ্রকে নিয়ে।
লালুঃ উপস্থিত। আমিও আছি। আমিও লিখেছি প্রখর রুদ্রকে নিয়ে। আর লিখতে লিখতে আমরা টপকে গেছি, আর এখানে চলে এসেছি।
জটায়ুঃ কিরকম কথা হলো, ফেলুবাবু এরা কি বলছে?
মগনলালঃ কি আঙ্কেল, আবার ভয় পেলেন মনে হচ্ছে। আরে ওই প্যাংলা বাদে বাকি দুজন মর্ত্যে আপনার ভূমিকায় ছিলো কিছুদিন। কি ঠিক বললাম তো ফেলু মিত্তির।
শ্যামরুপি ফেলুদাঃ ঠিকই বলেছেন মগনলালজী। লালমোহনবাবু একটু ব্যাপারটা পরিস্কার করে দিই। সে এক দুঃখের কথা। একে একে তো আপনি, মগনলাল তারপর আমাদের গ্রেট ডিরেক্টর শ্রী সত্যজিত রায় চলে এলেন এখানে। ওখানে তো ফাঁকা। অথচ পাবলিক ডিমান্ড। রায়বাবুর ফেলুদাকে সবাই দেখতে চায়। সাথে জটায়ু ও তোপসেকেও। ওনারই ছেলে সন্দীপ রায় পাবলিকের ডিমান্ড বুঝে ব্যবস্থা করলেন ফেলুদার সিরিজ। তবে তা বোকাবাস্কের জন্য। প্রতিভাধর অভিনেতা বেনুকে ফেলু মিত্তির সাজালো। আর জটায়ু করলো আমাদের গুপ্তকে। কিন্তু গুপ্ত হঠাৎ করে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে এলো এখানে। তারপর লালু এলো ওর জায়গায়, সেও চলে এলো এই অচেনা রাজ্যে।
মগনলালঃ হুম, আমি বসে বসে কি আর করবো। সব খোঁজ রাখি। মস্তি-ফস্তি আমার সহ্য হয় না। তাই এখানকার নিউজ পেপার আর চ্যানেল গুলো ফলো করি। সব খবর রাখি। তবে আমার কিন্তু আঙ্কেলকে বেশি পছন্দ। 😆😆 😆😆
জটায়ুঃ এই মরেছে রে। হাইলি সাসপিসিয়াস। (বলেই ফেলুদাকে জড়িয়ে ধরলো )
ফেলুদাঃ আরে ভয় নেই। কি করছেন।
(তিনমূর্তি জটায়ুর কান্ড দেখে হাসতে লাগলো ভীষণ)
ফেলুদাঃ তবে হ্যাঁ, বেনু কিন্তু দারুণ ভাবে মানিয়ে গেছে ফেলুদার সাথে। পাবলিকও ভালো ভাবে মেনে নিয়েছে। বেশ কটা ফেলুদা সিরিজ নিয়ে সন্দীপ সিনেমাও করে ফেললো। সব কটাই রেকর্ড করেছে। পাবলিকের কাছে দারুণভাবে সাড়া ফেলেছে। আর জটায়ুও কিন্তু দারুণ কামব্যাক করেছে 'বিভু'র মাধ্যমে।
জটায়ুঃ ও মাস্টার বিভু। সেই শিশুর ভূমিকায় অভিনয় করতো বিভিন্ন ঠাকুরের সিনেমায়।
ফেলুদাঃ একদম ঠিক লালমোহনবাবু। কিন্তু সেই বিভুও আর রইলো না। জটায়ু চরিত্র যেন একটা আপনার কথা অনুযায়ী "হাইলি সাসপিসিয়াস" হয়ে গেলো। সবাই চলে এসেছে এখানে। এরপর আর কোনো জটায়ু হয়নি। তবে আবির বলে একটা ছেলে ফেলুদা হয়েছে সেখানে জটায়ুর ভূমিকা নেই।
মগনলালঃ তাহলে স্বর্গরাজ্যে এখন আঙ্কেলদের ভিড় কি বলেন আঙ্কেল। (বলেই হো হো হো করে হাসতে লাগলেন)  
জটায়ুঃ ও মশাই, ও যে হাসলেই আমি কেমন বিপদের গন্ধ পাই (ফেলুদাকে দেখে)
লালুঃ এটা কে রে? তখন থেকেই শুধু কেঁপে যায়।
সিধুঃ ও আঙ্কেল। আমাকে দেখেও আপনি চমকাচ্ছেন নাকি।
গুপ্তঃ আরে ভয় পাবেন না। আমরা সক্কলে আছি তো নাকি।
ফেলুদাঃ লালমোহনবাবু, আপনি অযথা ভয় পাবেন না। তারপর শুনুন, কিছুদিন আগে সৃজিত একটা সিনেমা করছে ফেলুদাকে নিয়ে, আর ভালো কথা জটায়ুকেও পেয়ে গেছে আর তোপসে তো থাকবেই। আমার কিন্তু আবির ছাড়াও এই ছেলেটাকে খুবই পছন্দ ছিলো ফেলুদার চরিত্রের জন্য, টোটা। এখনকার জেনারেশনের জন্য একদম ঠিকঠাক। তবে আবির নিজের পায়ে কুড়ুল নিজেই মারলো। শরদিন্দু বাবুর ব্যোমকেশ ওকে বেশ মানিয়েছিলো। কিন্তু ফেলুদা করতে গিয়েই যত বিপত্তি। যাক, সে নিয়ে আমার কাজ নেই। আমি আছি আমার নতুন ফেলুকে নিয়ে, টোটা। ইন্ডাস্ট্রি এতদিন ঠিক ভাবে ব্যবহার করেনি ওকে। বোধ হয় এবার সঠিক সিদ্ধান্ত।
লালুঃ তা আঙ্কেল একটু অপ্সরাদের নাচ দেখবেন নাকি? সাথে আরও কিছু ব্যবস্থা আছে। বোতল চলে নাকি।
গুপ্তঃ আহা লালু, ছ্যাবলানোটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। জটায়ুবাবু, প্লিজ কিছু মনে করবেন না। এই লালুটা একেবারে ছোটলোক। কাকে কি বলতে হয় জানে না।
সিধুঃ একাবারে ছ্যাঁচড়া। স্বভাবটা কোনোদিনও চেঞ্জ হবে না। এখানে এসেও যত আজেবাজে কান্ড করে।
লালুঃ ওরে প্যাংলা, তোকে দেখাচ্ছি মজা। (বলেই মাথায় এক গাঁট্টা)
সিধুঃ ভালো হবে না বলে দিচ্ছি লালু। খুন করে ফেলবো। 😡😡 😡😡  
শ্যামঃ ওঃ কি হচ্ছে? তোদের ঝগড়া কি এখানেও চলছে। এখানে এসেও শান্তি নেই। তোরা জানিস না, মর্ত্যে কি হচ্ছে।
সকলে একত্রঃ কি হচ্ছে।
শ্যামঃ চল আমি ফেলুদার মতো করেই না হয় বলি।
ফেলুদাঃ দুনিয়াটা বুঝি শেষ হতে চললো। মানুষ মানুষে ভেদাভেদ। ভূপেনদার গানটা কেউ গায় না আজকাল "মানূষ মানুষের জন্যে", তাই বুঝি এই হানাহানি। তারপর পরিবেশের উপর অযত্ন। বাড়ির বড়দের সম্মান নেই। নেতারা নিজেদের আখের নিয়েই ব্যস্ত। সারা দুনিয়ায় এক মারণ রোগের জীবাণু হানা দিয়েছে, তারই জেরে বিশ্বসংসার অচল। মানুষের কাজ কর্ম নেই। সবই আজ অনলাইনে সীমাবদ্ধ। আমি এই বয়সে কাজে বেরোলাম। ব্যাস ছোট জীবাণু আমাকেও অ্যাটাক করলো। ৪১ দিন লড়লাম। বয়স হয়ে গেছে যে। তাই চলে এলাম তোদের কাছে।
ঠিক আছে এসে গেছি যখন, সবাই মিলে শান্তিতেই থাকবো। আমরা নতুন ভাবনায় মেতে উঠবো সবাইকে নিয়ে। থাকবো তো একসাথে নাকি?
সকলেঃ নিশ্চয়ই
ফেলুদাঃ আর অবশ্যই চাইবো, পৃথিবী ফিরে পাক তার স্বাভাবিক ছন্দ। মানুষ আবার মেতে উঠুক নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্মে, শিল্পকর্মে। সব কিছু নতুন ভাবে শুরু হোক ভেদাভেদ ভুলে, হিংসা-দ্বেষ ভুলে। মানবতার জয় হোক। এই কামনা করি। সকলে ভালো থাকুক।
🙏🙏🙏
- রাজকুমার ঘোষ
ফেলুদা তথা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর সাথে বাকি সকল অভিনেতার প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। 😍😍  

প্রকাশিতঃ বরাহনগর সাহিত্য দর্পণ, ২০১৯ ... সৌমিত্র সংখ্যা