রাজকুমার ঘোষ # ২৬.০৫.২০২০
করোনা প্রভাবে মানুষ লকডাউনে ঘরেই বন্দী। রাজও ঘরে বন্দী গত দুই মাস। না আছে কাজ, শুধু খাও, আর ঘুমাও আর মাঝে মাঝে সোশ্যাল সাইটে গান গেয়ে, কবিতা লিখে পোস্টানো… এই ভাবে কেটে যায় দিন-রাত। খবরের কাগজ, নেট থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে পূর্বাভাস ছিলোই আমফাণ আসছেই। লোকমুখে তো প্রবল ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন এর আগেও কত আয়লা এসেছে। বিভিন্ন জায়গায় তার প্রভাব রেখে গেছে। আসুক তবে, দেখা যাবে… বিকেল থেকে আকাশ ঘন কালো। সবাই বলছে আমফাণ আসছে প্রবল ফণা তুলে। আস্তে আস্তে ঝড়ের একটা প্রভাব লক্ষ্য করার মতো। ছাদে গিয়ে সে দেখলো, আকাশ কালো রঙে ছেয়ে গেছে। গাছগুলো নাচের একটা ছন্দ পেয়ে গেছে। প্রবল ভাবে দুলতে লাগলো। তাদের ঝড়া পাতা আর ডাল গুলো উড়ে আসতে লাগলো। আশে পাশে বাড়ির টিনের ছাউনিগুলো লাফাতে লাগলো। শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। ঝোড়ো হাওয়ার সাথে বাড়ির জানলাগুলোর কিছু কাঁচ ঝনঝনিয়ে উঠলো। সবল ঝাপটায় বৃষ্টির জল ঢুকে পড়লো জানলা দিয়ে, দরজার তলার নিচের ফাঁক দিয়ে। ভিজিয়ে দিলো মেঝে। রান্না ঘরের জানলার কাঁচ ভেঙে জল ঢুকতে লাগলো। থালা-বাসন গুলো ঝনঝন করে আওয়াজ সহকারে পড়তে লাগলো। বাড়ির মেয়েরা সেই বাসনগুলো তুলে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো। এদিকে দরজা বা জানলা দিয়ে জল ক্রমাগত ঢুকতেই থাকে। বেশ কিছু কাপড় বা প্লাস্টিকের চট দিয়ে সেই জল আটকানোর এক অসম প্রচেষ্টা। কিছু সফল বলা যেতে পারে। বাড়িতে বিদ্যুৎ কখনই চলে গেছে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে রাতের কালো নিকষ অন্ধকারে অনেকদিন পর আবর্জনায় পড়ে থাকা একটা মাত্র হারিকেন জ্বালানো হলো। কিছু মোমবাতি ছিল তাও জ্বালানো হলো। দেখতে দেখতে রাত হয়ে গভীর রাতে চলে এলো, কিন্তু ঝড়ের রেশ কমেনি। প্রবল হাওয়ার বিভৎস আওয়াজে এক বর্ণও চোখের পাতা দুটো এক করতে পারেনি রাজ। ঘুম তো আসেইনি। সকালের দিকে একটু ঘুম এসেছিলো। উঠতে প্রায় ৮টা হলো তার। ঘুম থেকে উঠেই ছেলে বললো,
- বাবা, বেশ কয়েকটা গাছ, ইলেকট্রিক পোল ভেঙেছে। এছাড়াও কিছুটা দূরে একটা বাড়ির পাঁচিল ভেঙে পড়েছে।
- বলিস কিরে… চল দেখি একবার বাইরে গিয়ে।
- আরে ঐ বাড়িটার ছাদে দেখো বাবা, কোনো বাড়ির টিনের ছাউনি উড়ে এসে পড়েছে।
খবর পেলো, আশে পাশের বাড়িতে বেশ কিছু গাছ ভেঙে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় ইলেকট্রিকের তার খুলে পড়েছে। সারাটা দিন, বিদ্যুৎ নেই, জলের সরবরাহ নেই। কি ভাগ্যিস রাজদের পাতকুয়া ছিলো। সেখান থেকেই জল সংগ্রহ করে নেওয়া হলো। খাবার জল আগে থেকেই সংগ্রহ করা ছিলো।
সারাটা দিন কিভাবে যে কেটে গেলো, সন্ধ্যে গড়ালো। বাড়ির মধ্যে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। মোমবাতি আর নেই। একমাত্র হারিকেনই সম্বল। সেটাই ব্যবহার করা হলো। একটা জায়গায় সে জ্বলে আছে আর সকলের দশা দেখে মিটমিট করে হাসছে। রাজ তার অভ্যাস মতো মা’র তৈরী করা চা পান করতে বাড়ির নিচের ঘরে চলে এলো। অন্ধকারে ফ্লাক্সে রাখা চা ছোট একটা গ্লাসে কোনোরকমে নিলো। একটা বিস্কুটও খুঁজে নিলো। বিস্কুট সহযোগে চা দু’-তিন চুমুক দেওয়ার পর সে তার মা’এর খোঁজ নিলো,
- মা, কোথায় তুমি? অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছি না কেন?
রাজের বাবা বারান্দায় ছিলো, তিনি এলেন লাইটার জ্বেলে। বললেন,
- ঘরে গরম তো? দেখ তোর কম্পিউটার রুমের ঘরের মেঝেতে ঘুমোচ্ছে।
- বলো কি? মেঝের মধ্যে ধুলো আছে। পিঁপড়ে, টিকটিকি কত কি ঘুরতে পারে। এইভাবে ঘুমোয় কখনো!
সে অন্ধকারে হাতরে হাতরে হাতে চা’র এর গ্লাসটা নিয়ে ঘরের দরজার কাছে এসে খুলতে গেলো দরজা। চা’র গ্লাসে একটা চুমুক দিতে গেলো। হঠাৎ অনুভব করলো, গ্লাসের সাথে লেগে থাকা কড়ে আঙুলে কি একটা হালকা স্পর্শ। মনে মনে সে বললো,
- কেমন একটা মনে হচ্ছে আমার?
রাজ বাবাকে বললো, বাবা গ্লাসের মধ্যে কি একটা পড়লো? কেমন একটা মনে হচ্ছে আমার।
- কি পড়বে?
- না গো, আমি চুমুক দিতে যাচ্ছি, কিন্তু আঙুলে একটা স্পর্শ পেলাম।
- দাঁড়া, লাইটারটা জ্বালি
লাইটার টা জ্বালানো হলো, টিম টিম করতে থাকা লাইটারে জ্বলতে থাকা আগুনে কিছুই বোঝা গেলো না। মোবাইলের সুইচ অফ, কাজেই অগত্যা গ্লাসটা নিয়ে রাজ ছুটে গেলো হারিকেনের কাছে। হারিকেন উঁচু করে ধরতেই রাজের চক্ষু চড়কগাছ। গ্লাসের মধ্যে থাকা চা’র মধ্যে পড়ে আছে একটা ছোট্ট টিকটিকি। গরম চা’র মধ্যে টিকটিকি পড়েই সেদ্ধ হয়ে ভাসছে। রীতিমত ও বিষ্ময়ে হতবাক।
রাজ চুপ করে সিঁড়ির একটা ধাপে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ পর নিজের অবস্থায় ফিরে ও ব্যাপারটা অনুধাবণ করলো। ওর মাকে যখন ডাকতে গেলো দরজা খুলে, তখনই ও চুমুক দিতে যাচ্ছিলো চা’র গ্লাসে। দরজার ওপরে থাকা ঝোলানো একটা ব্যাগের গায়ে আটকে ছিলো টিকটিকিটা, সেই মুহূর্তেই চা’র গ্লাসে পড়ে।
রাজ আর ভাবতে পারে না, সে সেই গ্লাসে থাকা চা সমেত মরা টিকটিকিটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। তারপর ছুটে গেলো সে তার আরাধ্য কুল দেবতার কাছে…
- জীবনে মরণতো এইভাবেই হতে পারতো। তুমি তা চাওনি। যতই করোনা আর আমফাণ আসুক… আমি আছি এখনো, কিছু বাকি কাজ আছে করার জন্য, আমার ছেলে, স্ত্রী এবং আমার পরিবারের পাশে থাকার জন্য।
রাজের স্ত্রী ছিলো সেখানে, সে সমস্ত ঘটনার সাক্ষী। সে বললো –
- আমরা ক্ষতি করিনি কারোর। আমাদের নিয়তি এইভাবে হতে পারে না। একদিন ঠিক সূর্যের আলোয় সব কিছু ফিরে আসবে। এই অন্ধকার সাময়িক।