রাজকুমার ঘোষ -
ছোট থেকেই আমি
ভিতু, হ্যাঁ ভিতু। ছোট বেলায় ঠাম্মা-দাদুর কাছে রূপকথার গল্প, ভূতের গল্প, তারপর
একটু বড় হতেই বিভিন্ন রহস্য গল্প বন্ধুদের মুখ থেকে শোনা বা বই পড়া সবই হতো। কেন
জানিনা অবচেতন মনে হাজার রকমের রহস্য ভয় মিশ্রিত ঘটনা চলে আসতো। আমার রহস্য ভয়
মিশ্রিত মন থেকে বেশ কতগুলো গা ছম ছমে ঘটনার একটি যা আজ গল্প আকারে সকলের দরবারে
হাজির করছি।
বহুদিন আগের এক
ঘটনা। তখন
সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি। তিন বন্ধু, আমি, পুলক আর আনন্দ, তিনজনের
মনের মধ্যে শহরের যান্ত্রিকতা, দুষন থেকে একটু বেড়িয়ে গ্রামের কোনো একটা জায়গায়
২-৩ দিন কাটানোর ইচ্ছা ছিলো। ইলেভেনে ভর্তি হয়েছিলাম, কাজেই পড়াশোনাও শুরু করে
দিয়েছিলাম। ঠিক হয়েছিলো, শীতকালের কোনো এক সময়ে ৩ দিন ছুটি কাটাতে যাবো কোনো এক
গ্রামের পরিবেশে। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের এই তিন বন্ধুর কারোর বাড়ি গ্রামে নয় বা
সেভাবে কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। অবশেষে, পুলকের দুঃসম্পর্কীয় কোনো এক কাকিমার বাপের
বাড়ি উদয়নারায়ণপুরের কাছে জয়নগরের কোনো এক গ্রাম্য জায়গায়, সেখানে যাবো ঠিক হলো।
আমরা তিন বন্ধু শীতকালে ঐ জানুয়ারীর ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে চলে গেলাম কাকিমার
সেই জয়নগরের বাপের বাড়ি। বেশ পুরোনো পাকা বাড়ি। কাকিমার দাদা মানে সম্পর্কে আমার
মামাই হবেন। তিনি সেই বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন না। তিনি একটি নতুন বাড়ী
করেছিলেন ওনার বাড়ির কাছেই, একটা ফাঁকা মাঠ ছিলো, তার মাঝেই সেই বাড়িটা। চারিদিকে
কি সুন্দর অনেক গাছ বসিয়েছেন। আম, নারকেল গাছ ছাড়াও বিভিন্ন ফুলের গাছ।
সত্যি! তিনজন এই পরিবেশ দেখে ভীষণ ভাবে মোহিত হয়ে পড়লাম।
এর মধ্যেই আমার
মনে এ প্রশ্ন এসে গেলো, মামা ঐ পুরনো বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন না কেন?
তা ওনাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম,
‘মামা, আপনি
পুরোনো বাড়িতেই তো আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারতেন, এই নতুন বাড়িতে আমাদের জন্য
সব কিছু ব্যবস্থা করছেন, আপনাকে অসুবিধায় ফেলেদিলাম আমরা’...
মামা জানালো,
‘আরে দূর, কি
সব বলো তোমরা, আমি খুব খুশি। তোমাদের আপ্যায়ন করতে পারলে আমার ভালোই লাগবে। দেখে নিও
তোমরা, একেবারে শহরের মত ব্যবস্থা করে রেখেছি এই বাড়িতে... কোনো অসুবিধা হবে না’
যাই হোক, সত্যিই
নতুন বাড়িতে দারুণ সব আয়োজন করে রেখেছেন উনি। তারপর পেল্লাই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা
করেছেন। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে গ্রামের চারিদিক দর্শন করার
জন্য তিন বন্ধু বেড়িয়ে পড়লাম। আগেই বলেছিলাম, আমি ভীষন ভীতু। পুলকেরও আমারই
অবস্থা, কিন্তু আনন্দ খুবই সাহসী ছেলে। গ্রামে মামার যে বাড়ি আছে মাঠের মধ্যে, সেই
মাঠ ছেড়ে বাইরের রাস্তায় যাবার বা মামার পুরোনো বাড়ি যাবার মধ্যে যোগাযোগ একটা সরু
রাস্তা। এই রাস্তা ছাড়াও মাঠের চারিদিকে প্রায় জঙ্গলে ঘেরা। বেশ কিছুদুরে
আছে একটা কালী মন্দির এবং তার সাথে লাগোয়া একটা শ্মশান। আমার আর পুলকের তো বেশ
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। সামনেই শ্মশান তার মানে রাতের বেলায় তেনাদের উপদ্রব হবে না
তো! কি করতে যে মামা এই নতুন বাড়িতে শোবার ব্যবস্থা করলেন কে জানে। সেদিন রাতে
খাবার খেয়ে রাত এগারোটা নাগাদ শুয়ে পড়লাম। মামা বলেছিলেন যে তিনজন চাইলে আলাদা
তিনটে ঘরে আমরা থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি বা পুলক চাইনি। পুলকই বললো, ‘না মামা,
আমরা একসাথেই এক ঘরে থাকবো’। মামাকে আমাদের ভয়ের ব্যাপারটা না জানানোই ভালো। আমার
ঘুম এলোনা। আনন্দ দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। বোধ হয় পুলকেরও ঘুম আসেনি। মনের
মধ্যে বারেবারে ঘুরপাক খাচ্ছে শ্মশানের ছবিটা। আর ভাবছি এই বুঝি তেনারা এসে আমাদের
ঘাড় মটকাবে। এই ভাবতে ভাবতে একটু আচ্ছন্ন এসেছে। হঠাৎ গভীর রাতে মনে হচ্ছে একটা
মেয়ে কন্ঠের হাসি দূর থেকে ভেসে আসছে, তারও একটু পরে দেখি ক্ষীন কন্ঠে করুণ
কান্নার শব্দ আসছে। এই শুনে আমাদের পিলে চমকানোর অবস্থা। চোখ বন্ধ রেখেও
রাখতে পারলাম না। চোখ খুলতেই দেখি মুখের সামনে একটা মুখ। আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়ে চিৎকার
করে উঠলাম, ‘কে রে?’। পুলকও চেল্লিয়ে বললো, ‘আমি রে’... ও বললো, ‘ভয়ে ঘুমোতে পারছি
না। কি একটা হাসি আর কান্নার আওয়াজ আসছে’। আমাদের আওয়াজে আনন্দর ঘুমের দফা-রফা। সে
উঠে লাইট জ্বালিয়ে বললো, ‘কি হলো রে তোদের? আচ্ছা ভীতুর ডিমের পাল্লায় পড়া গেলো
তো’। আমরা আনন্দকে জানালাম এই আওয়াজ নিয়ে। খানিকক্ষণ তিনজন চুপ করে থাকলাম। তারপর
আমরা সকলেই কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি আনন্দকে বললাম,
‘বিশ্বাস
হচ্ছিলো না তো। এবার তুইও শুনতে পাচ্ছিস... বল, এবারে কি বলবি তুই?’
আনন্দ বললো,
‘আরে কোথায় একটা মেয়ে কাঁদছে, এই নিয়ে অত ভাবার কি হলো! এখন ঘুমোতো। কাল সকালে
মামাকে জিজ্ঞেস করে নেবো। এখন প্লিজ আমাকে ঘুমোতে দে’।
আনন্দ ঘুমিয়ে
পড়লো আবার। আমি আর পুলক পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর লাইট নিভিয়ে শুয়ে
পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা। সকাল বেলা ৮টার সময় মামার ডাকে আমাদের ঘুম
ভেঙ্গে গেলো। মামার সাথে আরও দুজন কাজের লোক এসেছেন আমাদের চা আর জল-খাবার নিয়ে।
পুলকই একটু সাহস নিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মামা, এখানে কি ভূতের ভয় আছে? কাছেই
তো শ্মশান তাই জিজ্ঞেস করছি’। মামা আমাদের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালেন, তারপর
‘হো...হো...হো’ করে অট্টহাস্যে হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমরা শহরের ছেলে হয়ে কি ভূতের
কথা বলছো গো ভাগ্নেরা... কাছে শ্মশান আছে তো কি হয়েছে?... এইসব ফালতু চিন্তা করো
না... ভালোভাবে গ্রাম ঘুরে আনন্দ করো’। আমি বললাম, ‘গতরাত্রে একটা মেয়ে
হাসি তারপর কান্নার আওয়াজ পেলাম যে’ ...
মামা এরপর
বললেন, ‘তো কি হয়েছে? একদম বাজে চিন্তা করো না। ও কিছু না। কে না কে হাসছে বা
কাঁদছে তাতে তোমাদের আনন্দের মাটি হওয়ার কিছুই নেই। বাদ দাও সব। এখন হাত মুখ ধুয়ে
চা জলখাবার খেয়ে যাও ঘুরে এসো। কাছাকাছি দুই তিনটে মন্দির আছে... বেলায় খাওয়ার সময়
আবার দেখা হবে’।
অগত্যা, আমি আর
পুলক আশাহত হলাম। আনন্দ আমাদের তো গিলে খাবে। বললো, ‘কি ভীতুরে তোরা, তোরা আমার
বন্ধু, ভাবতেই অবাক লাগে’।
আমরা
চা-জলখাবার খেয়ে নিয়ে সেদিন গ্রামের রাস্তা দিয়ে অনেক পথ হাঁটলাম। সুন্দর গ্রামের
পরিবেশ, নির্মল হাওয়ার আস্বাদ পেলাম। মামার কথা অনুসারে এখানে কতগুলো পুরনো মন্দির
ছিলো দেখলাম। বিশেষ করে শ্মশানের পাশে কালীমন্দির আমি আর পুলক বেশ ভালো করে
দেখলাম। আর শ্মশানের চারিদিক ভালো করে দেখতে থাকলাম। আনন্দ সেটা টের পেয়ে আমাদের
বললো, ‘আজ রাতে তোদের দুজনের ঘাড় মটকাবে সেই মেয়েটা, দেখে নিস’ বলেই
‘হা...হা...হা’ করে হাসতে লাগলো। কিন্তু শ্মশানের আশেপাশে আমরা কিছুই পেলাম না।
যাই হোক সেদিনের মত আমরা দুপুর বেলায় ফিরে খাওয়ার টেবিলে চলে এলাম। মামার পুরোনো
বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার সুন্দর আয়োজন করেছে। খাসির মাংস, গলদা চিংড়ির মালাইকারি সহ
আমাদের ভোজন দারুণ হলো। সাথে পায়েস, দু-তিন রকমের মিস্টি... দুর্দান্ত রান্না। পেট
পুরে খাওয়ার পর আমরা চলে এলাম নতুন বাড়িতে। এসেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সেদিনের মত আর
বেড়োয়নি। বাড়িতেই কাটালাম আমরা। মামা আর তার কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন, তাদের
সাথে তাসের আড্ডা জমে গেলো। রাত্রি হতেই আমরা হালকা ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
কিন্তু ঘুম কোথায় আমার চোখে? পাশে পুলকের অবস্থাও আমার মতোই। ওকে আলতো স্বরে
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে ঘুমাসনি?’ ও বললো, ‘ধুস, ঘুম আসবে কি করে? শুধু শ্মশানের কথা
মনে পড়ছে’।
দুজনে মিলে অন্ধকারে বসে আছি আর নিজেদের মধ্যে মৃদু স্বরে কথা বলছি। আর
আনন্দের নাকের ডাক শুনছি। রাত বাড়ার সঙ্গে চারিদিকের নিস্তব্ধতা আরও বাড়তে লাগলো।
ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ কানে আসতে লাগলো। সেই সকল নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে হঠাৎই গতকালের
সেই মেয়ের কন্ঠে হাসি এবং তারপরের কান্নার আওয়াজ আসতে লাগলো। আমরা দুজনে
আতংকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। অজান্তেই আমরা দুজন চেঁচাতে লাগলাম। আমাদের
চেল্লানোয় আনন্দের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ও বলল, ‘কি জ্বালা বলতো তোদের নিয়ে? নিজেরাও
ঘুমোবি না আর আমাকেও ঘুমোতে দিবি না। আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে দেখছি। চল জামা
কাপড় পড়ে নে। কোথায় তোদের ভয় দেখবো আমি’ এই বলে আনন্দ লাইট জ্বালিয়ে জামা কাপড় পড়ে
নিলো। আমরা না চাইলেও ওর কথায় জামা কাপড় পড়ে নিলাম। আনন্দ ভীষণ রাগি, তাই বাধ্য
হয়ে আমরা ওর কথা অনুযায়ী জামা কাপড় পড়ে রাতের অন্ধকারে এই অপরিচিত গ্রামের রাস্তায়
বেড়িয়ে পড়লাম। হাতে একটা টর্চ নিলো আনন্দ। বাড়ির সামনে সরু রাস্তা দিয়ে আমরা
এগোচ্ছি। তার খানিকবাদে জঙ্গল, রাতের অন্ধকারে জঙ্গলটাকে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল
দৈত্যের মুখ। ভয়ে ভয়ে আমি আর পুলক আনন্দের পিছু পিছু এগোচ্ছি। বিশেষ করে ঐ কান্নার
আওয়াজ শুনে আমরা এগোচ্ছি। জঙ্গল পার হয়ে আমরা এবার চলে এলাম কালীমন্দিরের কাছে,
তারপর শ্মশান। সেখানে এসে দেখি সেই কান্নার আওয়াজটা আরও জোরালো হয়েছে। আনন্দ সেই
আওয়াজের সূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে। আমদের অবস্থা শোচনীয়। ভয়ে চেঁচাতে চাইলেও
চেল্লাতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন বুকের মধ্যে আধ মন পাথর কে যেন চাপিয়ে দিয়েছে।
সেই পাথর বয়ে বেড়াচ্ছি এই ঘন অন্ধকার রাতে। আনন্দ এগিয়ে চলেছে আর আমরা তার পেছনে।
ক্রমশঃ ঐ আওয়াজের সন্নিকটে আসছি আমরা। শ্মশান পেড়িয়ে আরও একটি সরু রাস্তা, রাস্টার
দুই পাশে ঘন জঙ্গল। অন্ধকারে সেই ভয়ার্ত পরিবেশে নিজেকে অসহায় লাগছে। আমি আর পুলক
সেই ভয়ার্ত পরিবেশে নিজেদের আত্মসমর্পন করে দিয়েছি। কিন্তু আনন্দের সেইদিকে
বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। অদম্য ওর মনের জোর। ও খুঁজে বের করবেই, কি এমন রহস্য এই
আওয়াজের পেছনে। হাতে টর্চ নিয়ে ও এগিয়ে চলেছে আরও সামনে দিকে। রাস্তা পেরিয়ে চলে
এলাম আমরা একটা জলা জমির মাঝে। দেখলাম একটা কুঁড়ে ঘর আছে সেখান, হালকা আলোর রশ্মি
বেড়িয়ে আসছে সেই ঘর থেকে। মনে হচ্ছে আওয়াজটা সেই ঘর থেকেই আসছে। আনন্দ দেখলাম ঘরটাকে
দেখেই ছুটতে লাগলো। ও বললো, ‘পেয়েছি... পেয়েছি... তোদের পেত্নীর খোঁজ পেয়েছি’।
আমরাও ওর পেছন পেছন দৌড়তে লাগলাম ঘরটাকে উদ্দেশ্য করে। ঘরের কাছে আসতেই শুনতে
পেলাম মেয়েলি কন্ঠের সেই ভয়ার্ত কান্না। আনন্দ সেই ঘরের দরজায় টোকা মারলো। আমরা
ভাবছিলাম এখান থেকে পালাই যেদিকে মন চায়। আনন্দের ঘাড় মটকে খাক পেত্নী। ওর সাহস ওর
কাছেই থাক। কিন্তু ঘরের দরজায় জোরে জোরে টোকা মারলেও দরজা কেউ খুলছে না। আনন্দ
এবার বজ্রকন্ঠে বললো, ‘কে আছেন ঘরে, খুলুন বলছি’। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম দরজাটা
খুলে গেলো। অন্ধকারে একটা মানুষ বেরিয়ে আসছে। আনন্দ তার মুখে টর্চ জ্বালিয়ে বললো,
‘কে তুমি?’ আমরা তো ভয়েই চোখ বন্ধ করে দিয়েছি। দেখলাম একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো,
‘আমি নিতাই গো বাবু, কিন্তু এত রাতে আপনারা এখানে কি করছেন বাবুরা?’ চোখ খুলতেই
দেখি একজন রোগা পাতলা মানুষ, লুঙ্গি পড়ে আছে। যার নাম নিতাই। সে আমাদের সামনে
দাঁড়িয়ে। আনন্দ বললো, ‘এত রাতে কে কাঁদছে এখানে? আমরা আসছি সেই শ্মশানের পাশে যে
বাড়িটা আছে সেখান থেকে। তোমার ঘর থেকে এই হাসি-কান্নার আওয়াজ আসছে আর আমাদের ঘুমের
ব্যাঘাত হচ্ছে। হচ্ছেটা কি? রাতের বেলা যত ইয়ার্কি!’ জবাবে নিতাই বললো, ‘আজ্ঞে
বাবু, কিছু মনে করবেন না। আমার বউটা এক্কেবারে পাগল হয়ে গেছে, রাত হলেই ওর
পাগলামীটা বাড়ে... আসলে তোমাদের মত একটা ছেলে ছিলো আমাদের। এক মাস হলো ছেলেটা
সাপের কামড়ে মারা গেছে বাবু... আমার বৌটা তারপর থেকে পাগল হয়ে গেছে, কি করবো বলতে
পারেন?’ আমরা আর কথা বাড়ালাম না। সেখান থেকে তড়িঘড়ি চলে এলাম বাড়িতে। হঠাৎই যেন
চোখের সামনে কত কি ভেসে এলো বলে মনে হলো। মুহূর্তের ভাবনায় আমাদের চোখে কখন ঘুম
চলে এলো জানিনা। সকাল ৯টায় মামা এসে দরজার কড়া নাড়তেই আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
মামা আসতেই গতকালের রহস্য উদ্ঘাটনের ঘটনা সবিস্তারে জানালাম তাঁকে। মামা শুনে
রীতিমত বাহবা দিলেন আমাদের সকলকে। বললেন,
‘তোমাদের এখানে
আসার উদ্দেশ্য সার্থক তবে বলো। একটা দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হলো তোমাদের। তোমরা যেদিন
বললে ঐ কান্নার আওয়াজটা সম্বন্ধে। আমি তোমাদের এড়িয়ে গেছিলাম, কিছুই জানাইনি আমি।
যাই হোক খুব ভালো লাগলো তোমাদের সাহস দেখে’।
পুলক বললো,
‘আমাদের অত সাহস নেই মামা... এখানে যা কৃতিত্ব সবই আনন্দের। ঐ আমাদের হীরো।
পড়াশোনা বলো, খেলাধুলা বলো আর দুঃসাহসিকতা বলো... আনন্দ আমাদের হীরো’।
আনন্দ বলে,
‘আরে এই অভিযান আমাদের সকলের’।
মামা বললেন,
‘নিতাইয়ের একটা ছেলে ছিলো তোমাদের বয়সী, একমাস আগে সাপের কামড়ে ছেলেটি মারা যায়,
তারপর থেকে নিতাইয়ের বৌ পাগল হয়ে যায়। রাত হলেই বৌ টা হাসতে থাকে, তারপর
কান্নাকাটি করে। একমাত্র ছেলেতো, শোকে দুঃখে পাগল হয়ে গেছে। আর একটা কথা যে রাস্তা
দিয়ে তোমরা ওদের বাড়িতে গেছো, সেই রাস্তা মোটেই ভালো না... কারণ ঐ রাস্তাতেই
নিতাইয়ের ছেলে সাপের কামড়ে মারা যায়। ঐ রাস্তায় সাপের উপদ্রব ভীষণ। বলতে গেলে ঐ
রাস্তা দিয়ে কেউ যায়না। তোমরা ঐ রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসেছো মানে অসাধ্য সাধন করেছো। যদিও
সাপের উপদ্রব দিনের বেলাতেই বেশি। কিন্তু তোমাদের সাহসিকতার কথা যতই বলি ততই কম
হবে। খুব খুশি আমি। এইভাবে তোমরা এগিয়ে চলো’। সেদিন আমরা বেলার লাঞ্চে মহাভোজ করে বিকেলের
ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে এলাম।
আজও রহস্য বা
অ্যাডভেঞ্চারের কোনো ঘটনা বলতে গেলে আমার স্মৃতির দোরগোরায় চলে আসে এই ঘটনাটা।
এখনও যোগাযোগ আছে আমাদের তিন বন্ধুর সাথে। পুলক আর আমি আমাদের জায়গাতেই আছি। আমরা
একই অফিসে চাকরী করি। মোবাইলে, ফেসবুকের মাধ্যমে আনন্দের সাথে যোগাযোগ আছে। ও এখন
মিলিটারিতে আছে কর্ণেলের পদে। কখনও কাশ্মীর, কখনো বাংলাদেশের বর্ডার, কখনও
কার্গিল, এইভাবে ওর ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। ওর অসীম সাহস ছিলো, এই ধরণের পদই ওর
জন্য যোগ্য। ও আমাদের গর্ব। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে এই ধরণের একটি ঘটনায় ওর সাথে
আমরা ছিলাম।
প্রকাশিতঃ ASPIRATION
MAGAZINE, BPIE COLLEGE… BISHNUPUR, 2019