Monday, April 6, 2020

ছোটগল্প- নিজেকে খুঁজে পাওয়া



জীবনের খেলায়
*নিজেকে খুঁজে পাওয়া*
রাজকুমার ঘোষ
আরোগ্য নিকেতন নার্সিং হোমের গেটের সামনের রাস্তায় গত কদিন ধরে কৌতুহলী জনতার ভীড়ে নাজেহাল অবস্থা। অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস। লোকাল এম.এল.এ'র মা কদিন ধরেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা কষছিল। এম.এল.এ তথা পাড়ার সবার দাদা পতা ওরফে প্রতাপ ধারা নার্সিং হোমের ম্যানেজমেন্টকে শাসিয়ে ছিল - আমার মাকে বাঁচাতে না পারলে গোটা নার্সিং হোমকে উড়িয়ে দেবো৷ শালা কাউকে ছাড়বো না।
তার এই শাসানিতে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ডাক্তার সুবর্ণ ঘোষালের কৃতিত্বে মৃতপ্রায় পতার মা ফিরে পায় জীবন। ডাক্তারের অসাধ্য সাধন ৷ পতা আপ্লুত। কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারের পা ধরে বলেছিল
- ভগবানকে আজ দর্শন করলাম৷ ডাক্তার আপনি না থাকলে মাকে ফেরাতেই পারতাম না। আজ থেকে এই পতা আপনার গোলাম। যখন যেমন প্রয়োজন পড়বে এই পতাকে স্মরণ করবেন, এই পতা তার সাথীদের নিয়ে আপনার দরবারে হাজির হয়ে যাবে।
এদিকে ডাক্তার সুবর্ণ ঘোষালের জয়জয়কার। মিডিয়া থেকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে তার এই অসাধ্য সাধন ছড়িয়ে পড়েছে। অপারেশন সফল ভাবে হওয়ার পর মিডিয়ার ভীড় নার্সিং হোম চত্বরে হয়েছিল, মিডিয়ার লোক একটি বারের জন্য ডাক্তারের সাথে কথা বলতে চায়। ডাক্তার মিডিয়ার কাছে এসে জানায়
- আজ থাক, আমি ভীষণ ক্লান্ত। আপনারা এক কাজ করুন, দুদিন বাদে পুজো শুরু। ষষ্ঠীর দিন সকালে আমাদের বাড়ি চলে আসুন। সেদিনই আমি কথা বলবো।
ষষ্ঠীর দিন সকাল, ডাক্তার সুবর্ণ ঘোষালের বাড়ি। বাড়ির সামনে বিশাল পুজোর চাতাল। সেখানে পুজোর আয়োজনে অনেকেই ব্যস্ত। হয়তো খানিক বাদে ঠাকুর চলে আসবে। মিডিয়ার লোক আস্তে আস্তে আসতে শুরু করেছে। তারা আজ ডাক্তার সুবর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার নিতে চায়।
যথা সময়েই ডাক্তার প্রেসের লোকের সামনে চলে এলো। একজন সাংবাদিক ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বলে, আপনি তো যুব সম্প্রদায়ের কাছে একজন আইকন। এম.এল.এ প্রতাপ ধারার মা যিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন, তাকে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়ে দুর্দান্ত কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।
- আমি আমার কর্তব্য পালন করার চেষ্টা করেছি। একজন রোগীকে সুস্থ করার দায়িত্ব সকল ডাক্তারের কর্তব্য। হ্যাঁ রোগির অবস্থা ভীষন জটিল ছিল। সেখান থেকে ওনাকে আমি সুস্থ করেছি। একটা কথা বলি, আমাকে কৃতিত্ব না দিয়ে বরং পতাকে দিন। ওই ওর মাকে ফিরিয়ে এনেছে।
উপস্থিত সকল মিডিয়ার লোক ডাক্তারের এই কথা শুনে অবাক হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওখানকার পরিবেশ নিস্তন্ধ। তাদের মধ্যেই একজন বলে উঠলো, ঠিক বুঝলাম না।
- পতা হলো ওর মায়ের আদর্শ সন্তান। গত এক সপ্তাহ ধরে সে সন্তান তার সমস্ত কাজ কর্ম ভুলে তার মায়ের সুস্থতার জন্য নার্সিং হোমের ভিজিটিং রুমে দিনরাত এক করে দিয়েছে। তার মা সুস্থ না হয়ে পারে না। হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি। ওর মায়ের প্রতি ব্যকুলতা আমাকে আরও জেদি করে তুলেছিল, যে করেই হোক আমি ওর মাকে সুস্থ করে তুলবো।
একজন সাংবাদিক বলে,- এতো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, যে এক মা এর প্রতি তার সন্তানের ব্যকুলতা থাকবে।
- না, পতার মত কারোর নেই। এমন কি আমারও নেই। আপনাদের কথা অনুযায়ী আমি একজন সমাজের জনপ্রিয় ডাক্তার। সমাজের গণমান্য প্রতিনিধি। আমি কি করেছি আমার বিধবা মার জন্য। এই দেখুন আজ পুজোর ষষ্ঠীর দিন। বাড়িতে ঠাকুর আসছে। সবাই ব্যস্ত। আমার স্ত্রী নতুন শাড়ীতে সজ্জিত সাথে তার মাকেও নতুন শাড়ীতে সাজিয়ে রেখেছে। কেন আমার মাকে সাজায়নি? আমার মা যে এই ঘরের এক কোণে পড়ে আছে। যে তার সন্তানের কামনায় সারা দিন রাত ভেবে থাকে। আমিই বা কিরকম সন্তান। যাকে একটুও সময় দিতে পারি না। প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যাই, ফিরি রাতে। আমার মায়ের দিকে ঘুরেও তাকাইনা। সে কি খেলো? সে কি পড়লো? তার শরীর কেমন আছে? শুধুই ব্যস্ততা আর টাকা পয়সার পেছনে ছুটে চলা। কিন্তু পতা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। ওর করুণ আর্তি আমাকে সব কিছু মনে করে দিয়েছে। জীবনের খেলায় পতা আমার মত নামমাত্র এক অখ্যাত-বিখ্যাত ডাক্তারকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে৷ ওর এই মনোভাবকে কুর্ণিশ জানাই। আমার ডাক্তার হওয়ার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন আমার মা। আমার জগৎ জননী। আজ ষষ্ঠীর দিনে আমাদের বাড়িতে মা দুর্গার মূর্তি আসছে। সকলে ব্যস্ত মাটির এই মূর্তিকে স্বাগত জানাতে। অথচ ঘরের মধ্যে একজন জীবন্ত মা দূর্গা আছে তার দিকে ঘুরেও তাকাচ্ছি না। ছি ছি ধিক্কার জানাই আমাদের মত সন্তানকে। তাই আমি ঠিক করেছি আজ থেকে প্রতিটা দিন আমি আমার মায়ের সাথে একটু হলেও সময় দেব, মাএর সাথে থাকবো। এই পুজোর কদিন আমি আমার দুর্গা মার সাথে কাটাবো সারাক্ষণ।
একজন মিডিয়া সাংবাদিক তাদের শিরোনামে নতুন করে শব্দ সাজাচ্ছেন, ডাক্তারের মহানুভবতা আরও একবার সকলের সামনে ... ডাক্তার সুবর্ণ ঘোষাল সেই শব্দগুলো লক্ষ্য করেই ছুটে এলেন তার কাছে, উনি বললেন – আমি দেবো নতুন শিরোনাম... অবশেষে একজন ডাক্তার প্রকৃত মানুষ হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেলো।
তিনি আরও বললেন, এ শুধু আমার জীবনের ক্ষেত্রে নয়, এই সমাজের সকল মানুষের কাছে বার্তা। সকল ব্যস্ত মানুষ তাদের জীবিত বয়স্ক মায়েদের জন্য যেন একটু সময় দেন। বিধবা মায়েদের শেষ আশ্রয় যেন বৃদ্ধাশ্রম না হয়।
প্রকাশিতঃ আমাদের লেখা পত্রিকা, (সবুজ পত্রিকা), ২০১৯
 

রম্যরচনা - পটলার বায়োস্কোপ


  
রাজকুমার ঘোষ  -
পটলা অজ পাড়া-গায়ের ভীষণ গরীব পরিবারের ছেলে। ধোপার কাজ করে ওদের সংসার খুব কষ্টে চলত। ওদের পরিবার তথা গোটা পাড়ার মূল উপার্জন ধোপার কাজের উপরই নির্ভর করত। চার পুরুষ ধরে ওদের পারিবারিক কাজ এখন সেভাবে আর হয়না। তারপর ওই একমাত্র ছেলে, দুই দিদির সাথে দুই বোনও আছে। সংসারের হাল ধরতে ওকে শহরে চলে আসতে হয়।   এক পরিচিতের সুপারিশে সে এক ধনিবাবুর বাড়িতে কাজের সুযোগ পায় এবং তার সাথে বাইশ বছরের পটলার প্রথম বার শহরে পা রাখা। ভালোই লাগে তার... সে বাবুর বাড়ির কিছু কাজ করে এবং বাবুর একটি রেস্টুর‌্যান্টের দেখাশোনাও করে। বিকালে কাছাকাছি একটি পার্কে যায়, অনেক কিছুই দেখে তার ভালোই লাগে। আর একটা জিনিস ওর খুবই প্রিয়...  তা হল টিভি, যেটা ওকে আরও ভালো রেখে দিয়েছে। সারাদিন টিভিতে কত যে বায়োস্কোপ হয় তার ঠিক নেই... সেই রকমই একটি বায়োস্কোপ দেখে ও ভীষন ভাবে অনুপ্রানিত হয়ে পড়ল। গল্পের নায়ক ঠিক যেন ওর মত... গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ... হাতে একটি চ্যালা বাঁশ আর সবসময় তেল মাখিয়ে চকচক করে। আর সেই তেল মাখানো চ্যালা বাঁশটি নিয়ে নায়কের কত হম্বিতম্বি ! সুন্দরী হট নায়িকাও নায়কের প্রেমে অন্ধ, নায়ককে জড়িয়ে কত নাচ-গান, তারপর চুমা-চাটি ... পটলা নিজেকে সেই নায়কের জায়গায় রেখে দিয়েছে এবং সাধ করে একটি চ্যালা বাঁশও জোগা করে ফেলেছে, আর তাতে প্রতিদিন যত্ন করে তেলও মাখিয়ে রাখছে। বাঁশটিও আসতে আসতে পটলার তেল মাখানো যত্নে চকচকে হয়ে উঠেছে।      
একদিন পটলা তার তেল মাখানো বাঁশটি নিয়ে সেই নায়কের মত কেতা করে পার্কে ঘুরতে গেছিল। হঠাৎ সেখানে একটি হট মেয়েকে দেখে পটলা উৎফুল্ল হয়ে পড়ল। মেয়েটিকে বেশ দেখতে, তারপর একটি হাফ প্যান্ট ও পরনে একটি টাইট গেঞ্জী... ব্যাস আর দেখে কে ? ... বেশ উত্তেজিত হয়ে সে সেই বায়োস্কোপে দেখা নায়কের মত কায়দা করে মেয়েটির সামনে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়েটি দারুন চমকে গেল তার পর ‘এই গাঁইয়া... চল ফোট’ বলেই ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পটলাও দমবার পাত্র নয়, সেই নায়কের ভূত তার মাথায় চেপে বসে আছে... সে মেয়েটির পিছু নিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আর দেখতে পেল না।  মনটা খারাপ করে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ নজর গেল একটি ঝোপের দিকে, সেই জায়গাটি বেশ নিরালা ... আশেপাশে কেউই নেই। পটলা বেশ খুশি মনে এগিয়ে গেল সেই ঝোপের দিকে, সেখানে গিয়েতো পটলার চক্ষু চড়কগাছ। সেখানে গিয়ে আড়াল থেকে দেখে ঝোপের মধ্যে সেই মেয়েটির সাথে একটি ছেলেও আছে, মেয়েটির পরনে কিচ্ছুটি নেই, আর অদ্ভুত সব গোঙানির আওয়াজ শুনতে পেল, যা দেখে পটলার মুখে, ‘ছিঃ ছিঃ... অসভ্য...! অসভ্য...!’ । পটলা রেগে গিয়ে সেখান থেকে চলে এল এবং তার মনটাও খারাপ হয়ে গেল।  
সে নিজের বাসায় ফিরে প্রথমেই চ্যালা বাঁশটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। রাগে ফেটে পড়ল... অবশেষে নিজের অবস্থার কথা ভেবে শান্তও হল। এদের সাথে পাল্লা দেওয়া পটলার কম্ম নয়। যাই হোক সে আবার বাঁশটিকে তুলে নিয়ে পরম যত্নে আরো তেল দিয়ে সেবা করতে লাগল আর বাবুর বাড়ি ও রেস্টুর‌্যান্টে মন দিয়ে কাজ করতে থাকল, কিন্তু টিভি দেখা প্রত্যেকদিন তার চাইইই। 
তিনমাস পর, একদিন পটলা তার বাবুর রেস্টুর‌্যান্টে মন দিয়ে কাজ করছিল। সেদিন প্রচুর ঝড়জল হচ্ছিল। রেস্টুর‌্যান্টে কেউই আসেনি সেভাবে, সে একাই ছিল ... সেই ফাঁকে সে রাতের খাবার তৈরির ব্যবস্থা করছিল... আর বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছিল। রেস্টুর‌্যান্টের বাইরে একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গেছে, একটু মাথা বাঁচাবার জন্য সে রেস্টুর‌্যান্টের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মেয়েটির পরনে ছিল সাদা রঙের শাড়ি ... বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে মেয়েটির শাড়িটি শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। পটলা মেয়েটির শরীরটিকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে... কিন্তু মুখের দিকে চোখ যেতেই সে চিনতে পেরেছে মেয়েটিকে, এই মেয়েটি হল সেই ঝোপের মধ্যে গোঙানী... ‘থাক থাক থাক’ এই বলে পটলা নিজেকে স্থির করল। সে আর তাকালো না, নিজের কাজ করতে লাগল। হঠাৎ পটলা দেখল মেয়েটি ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে তারপর ওকে ‘আমাকে প্লীজ বাঁচান’ বলে হাতটাকে চেপে ধরেছে। পটলা মেয়েটিকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমার মত অসভ্য মেয়েকে বাঁচাতে আমার বয়েই গেছে, যাও এখান থেকে’ এটা বলার পর মুখ তুলে তাকালো এবং বুঝতে পারল যে জনা তিনটে ছোকরা মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছে। তাতেও পটলা বিচলিত না হয়ে মেয়েটিকে বলল, ‘আরে যাও ওদের সাথে, তোমার তো ওদেরই পছন্দ’ ...  কিন্তু কোথা থেকে একটা হাত পটলার চোয়ালে বেমক্কা পড়তেই পটলা ছিটকে গেল এবং তার সাথে তিনজন মিলে অনেক জানোয়ারের নাম দিয়ে, বোকা-পাগলা আরও কত কি শব্দ দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল, সেসবের মধ্যে ওর বাবা-মাকেও কোথা থেকে টেনে আনল। ব্যাস পটলার মাথা ঘুরে গেল, তারপর সে কোথা থেকে সেই তেল মাখানো বাঁশের চ্যালাটা নিয়ে তিন ছোকড়াকে রামধোলাই দিল। আর নিজেও ধোপার কাজ করেছিল, সেই জামা কাপড় কাচার মতই তিনজনকে ধরে এমন ঠ্যাঙালো, ওরা সেখান থেকে পালাল। এদিকে মেয়েটি এবার ওকে আরো জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুমিই আমার উদ্ধার কর্তা... আমি এবার কোথায় যাব?’ পটলা বলল, ‘আমি আর আমার এই তেল-বাঁশ তোমাকে বাঁচাইনি, বাবা-মাকে গালাগাল দিল বলেই...’ , পটলা মেয়েটিকে আরও অনেক কথা বলল, আর সেদিনের ঝোপের কথাও জানাল... মেয়েটি তার অবস্থার কথা বলল... সে তার মাকে বাঁচানোর জন্যই এত জঘন্য কাজ করে আসছে ... মেয়েটি কথা দিল, পটলা যদি ওকে মেনে নেয়, তাহলে আর এই কাজ করবে না... এবার পটলা খানিক চুপ... তারপর সে তার তেল মাখানো বাঁশটিকে সেখান থেকে নিয়ে চলে এল রেস্টুর‌্যান্টের ঠাকুর ঘরে, মা কালির চরণের কাছে গিয়ে, ‘হে মা...! বায়োস্কোপের বাঁশ-তেল তাহলে সত্যি ... !’,  বলেই হো হো হো করে আনন্দে হাসতে লাগল।          

ছোট গল্প- উড়ান



রাজকুমার ঘোষ-

শেঠ পাড়ারনিরালাআবাসনের বিজয়া সম্মিলনীতে এক বিচিত্রা অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ স্বপ্নিল সেন বাবুর অনুরোধ ফেলতে পারেনি স্বপ্নিল বাবু অর্থাৎ সুলেমান স্বপ্নিলের ছোট বেলার বন্ধু আজ ওর যে খ্যাতি তার পেছনে বাবুর অবদান সাংঘাতিক যেভাবে ওকে গাইড করেছে, ওর বাবা-মাও করেনি সেভাবেনিরালাআবাসনের সামনের দিকে বিশাল বড়ো মাঠে জনসমাগম, উপচে পড়া ভীড় আজ সবাই এসেছে ওকে দেখতে এবং সংবর্ধনা দিতে  নিজেকে আজ বিশেষ মানুষ ভাবতে ভীষণ লজ্জ্বা পেলো স্বপ্নিল মঞ্চে ঘোষক এলো, ওর নামের জয়জয়কার
- আমাদের এলাকার গর্ব, স্বপ্নিল সেন আজ শুধু আমাদের এলাকার নয়, সারা বাংলা তথা সারা দেশের গর্ব, যে ভাবে ও সারা ভারতব্যাপীসুর সঙ্গমপ্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান দখল করেছে যা এককথায় অসাধারণ আগামীদিনে ওর আরও সাফল্য কামনা করি ইতিমধ্যেই মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট সুরকারেরা ওকে দিয়ে তাঁদের আগামী ছবিতে গান গাওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন ও আরও এগিয়ে চলুক এখন ওকে বরণ করে নেবেন আমাদেরই আবাসনের বিশিষ্ট ডাক্তার তথা সমাজসেবী বিদ্যুৎ চক্রবর্তী     
নামটা শুনেই চমকে উঠলো স্বপ্নিলতাহলে কি ঋত্বিকা এই আবাসনেরই মেয়ে  
()
ছোট থেকেই স্বপ্নিল গান ভালোবাসতো পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা সেভাবে ছিলনা, কোনোরকমে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে ওর বাবা-মা চেয়েছিলো হয় আই.টি.আই বা কোনো টেকনিক্যাল কোর্সে ভর্তি করে দেবে সেই অনুযায়ী ও আই.টি.আই-তে ভর্তিও হয়েছিলো ওর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে কলেজের ফ্যাকাল্টি সুবিমল বাবু ওর বাবাকে জানান –
- আপনার ছেলে কলেজের সোশ্যালে কি অসাধারণ গানটাই না গাইলো
ওর বাবা তো এ কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন
- কি! কলেজে পড়াশোনা না করে গান গাইছে, ঠিক আছে ওর কলেজ যাওয়া বন্ধ!
ওকে সটান বলে দিলো,
- তোর দ্বারা কিছু হবে না, গান গেয়ে কি হবে শুনি? তোকে আর কলেজে যেতে হবে না, কাল থেকে তুই আমার ব্যবসা দেখবি, আর পরীক্ষার সময় শুধু কলেজে যাবি
সেই যে বলা, ওর কলেজ যাওয়া বন্ধ বাবা ও মাকে ভীষণ ভয় পায় স্বপ্নিল একমাত্র ওর বন্ধু বাবু তথা সুলেমান ওর গান নিয়ে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করতো ওকে কোন জায়গায় গান শেখানো যায় এবং কোথায় কোথায় গান গাইলে ওর নাম-ডাক হবে সেই নিয়ে বেশি ভাবতো ওর বাবা-মাও ঘূণাক্ষরে জানতে পারেনি ওদের এই প্রচেষ্টার কথা
()
ওদের স্টেশনারীর বড় ব্যবসা ছিলো। বেশ নাম-ডাক। কলেজে যাওয়া বন্ধ, কার্যত স্বপ্নিলকে ওদের ব্যবসার জায়গায় বসতে হয়। এক দুর্গাপুজার পঞ্চমীর দিন বেলা নাগাদ কিছু বখাটে ছেলে-মেয়ে ওর দোকানে আসে জিনিসপত্র কিনতে। অনেক কিছু জিনিস কিনে টাকা-পয়সা দেওয়ার সময় ওরা বাজে ব্যবহার করতে আরম্ভ করলো। খেস্তা খিস্তি গালিগালাজ তো ছিলোই, এমনকি আপাত নিরীহ স্বপ্নিলকে ব্যতিবস্ত করে তুলছিলো ওরা। যা দাম, তার অর্ধেক টাকা ধরিয়ে দিয়ে আরও দু-চারটে জিনিস জোর করে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। স্বপ্নিল চিৎকার করতে গেলো, ওদের বাধা দিতে গেলো। এদের দলেরই একটি মেয়ে ঋত্বিকা সাইকেল নিয়ে পালাতে গিয়ে একটা বাইকের সাথে মারাত্মক ভাবে এক্সিডেন্ট করলো। দলের বাকিরা যে যার মত পালিয়ে গেলো, স্বপ্নিল দৌড়ে এসে দেখে ঋত্বিকা রাস্তায় পড়ে আছে, ওর মাথা ফেটে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে। সাথে সাথেই ওর পরিচিত একজনকে বলে,
-  এই ভাই একটু দোকানটা আমার দেখিস, দেখি এই মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় ভর্তি করা যায়’।
ঋত্বিকার আর জ্ঞান নেই। স্বপ্নিল ঐ অবস্থায় একটা অটো ভাড়া করে ঋত্বিকাকে নিয়ে চলে আসে একটা নার্সিং-হোমে। নার্সিং-হোমের অনেকেই ঋত্বিকাকে চেনে, তাদেরই একজন বললো,
- ডাক্তার বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর মেয়ে, ঋত্বিকা তো! কি ভাবে এক্সিডেন্ট হলো, গুরুতর জখম তো’!
- ঠিক আছে, আগে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন, ওর বাড়ির লোককে জানান’।
ডাক্তার বিদ্যুৎ চক্রবর্তী এলেন, সব কিছু শুনলেন স্বপ্নিলের কাছ থেকে। স্বপ্নিলকে বললেন,
- তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো, ভাষা নেই। আজকালকার দিনে এই ভাবে কেউ ভাবে না, তার ওপর তোমাকেও ওরা বিরক্ত করেছে, ওর হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি বাবা। ওর মেলামেশা ভালো না। কি যে করি মেয়েটাকে নিয়ে, যাই হোক, তোমার নাম কি বাবা? তুমি কোথায় থাকো?
স্বপ্নিল সবকিছু জানিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলো। পরে আর খোঁজ খবরও নেয়নি ও। তবে সুলেমানের থেকে জেনেছে ঋত্বিকা ভালো হয়ে গেছে।
(৪)
এরপর স্বপ্নিলের বাবা ওকে দোকানেও আসতে বারণ করেছে। এই ঘটনার জন্য স্বপ্নিলকেই দায়ী বলে জানিয়েছেন উনি। স্বপ্নিলও আর দোকানে বসেনি। সে এরপর কলেজে কোর্স সম্পূর্ণ করছে তার সাথে গোপনে তার গানের চর্চাও চালিয়ে গেছেএকমাত্র সুলেমানের জন্য ও বিভিন্ন গানের অডিশনে যোগ দিয়েছে। বিভিন্ন জলসা থেকে গান গাওয়ার আমন্ত্রণও আসে। স্বপ্নিল গোপনে সেই সব জলসায় যায়। ওর নাম-ডাকও ছড়িয়ে পড়ে। সুলেমানের সৌজন্যে ও মুম্বাইয়ে যায় সেখানেও সে বিভিন্ন অডিশনে গান গায়। প্রায় বছর দুই মুম্বাইয়ে থাকে। বাবা-মা’র সাথে যোগাযোগ রাখলেও বাবা-মা তাদের ছেলেকে প্রায় ত্যজপুত্র করে দেয়। দু’বছর কঠোর পরিশ্রম করে স্বপ্নিল মুম্বাইয়ের এক মেস বাড়িতে থেকে নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকে। তারপর সারা ভারত ‘সুর সঙ্গম’ প্রতিযোগিতায় নিজের নাম লেখায়। নিজের যোগ্যতার প্রতি বিশ্বাস রেখে সে প্রথম স্থান দখল করে ফিরে আসে বাড়িতে। ওর বাবা-মাও ছেলেকে কাছে পেয়ে ভীষণ ভাবে আপ্লুত। ওরা এখন স্বপ্নিলকে নিয়ে গর্ব অনুভব করে।
(৫)
প্রায় ৫ বছর পর ডাক্তার বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর হাত থেকে সম্বর্ধনা নিচ্ছে ও ডাক্তার বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আজ স্বপ্নিলের সাথে ওর বাবা-মাও এসেছেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী মাইক্রোফোন হাতে বললেন,
- তুমিই সেই ছেলে যে আমার মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়েছিলে আমি তোমার খোঁজে গিয়েছিলাম তোমার দোকানে, তোমার বাবার সাথে দেখাও হয়েছিলো উনি বললেন, স্বপ্নিল বলে কেউ থাকেনা এখানে, ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম বাবা আমার মেয়েও তোমার সাথে অনেকবার দেখা করতে গিয়েছিল, কিন্তু তোমার দেখা পায়নি বাবাআজও সে তোমার প্রতিক্ষায় আছে ভীষণ খারাপ লাগছে তোমাকে বলতে তবুও বলছি, তুমি কি আমার মেয়ের হাত ধরবে বাবা’? দরকার হলে আমি তোমার বাবা-মা এর সাথেও কথা বলবো
স্বপ্নিল জানায়,
- কি বলছেন কাকাবাবু? আমি খুবই সাধারণ ছেলে, পড়াশোনায় ভালো ছিলাম না গানের প্রতি ভালোবাসা ছিল আমার বন্ধু বাবু না থাকলে আমি এই জায়গায় কখনোই আসতে পারতাম না আমি আপনার মেয়ের যোগ্য নই
মঞ্চের আর এক প্রান্ত থেকে মাইকে ভেসে আসে,
- আজ তুমি বিখ্যাত হয়েছো বলে আমি বলছি না, সেদিন যখন আমার এক্সিডেন্ট হয়েছিল, আমার সব বন্ধুরা সেদিন পালিয়ে গিয়েছিলো কিন্তু তুমি আমাকে যেভাবে বাঁচাবার জন্য করেছিলে এবং আমি নিজেকে সুস্থ ভাবে ফিরে পেয়ে বারে বারে তোমার খোঁজ করেছি সেদিনই স্থির করে নিই আমার এই জীবনের সকল দায় তোমার তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না  
নিরালা আবাসনের বড় মাঠে রীতিমত কোলাহল শুরু হয়ে গেছে সকলে ঋত্বিকার দিকে তাকিয়ে আছে, এমনকি স্বপ্নিলের দিকেও সবাই তাকিয়ে আছে স্বপ্নিল ভীষণ ভাবে লজ্জ্বা পেয়ে গেলো ওর বন্ধু বাবু পরিস্থিতি সামাল দিতে মাইকে জানালো,
- আচ্ছা, আচ্ছাআমি কাকু কাকিমা মানে স্বপ্নিলের বাবা-মাকে ডেকে নিচ্ছি এ ব্যাপারে তাদের কি মতামত আছে
স্বপ্নিলের বাবা-মাকে মঞ্চে ডেকে নেওয়া হল ওর বাবা জানায়,
- আমি আমার ছেলেকে চিনতে পারিনি এ আমার ব্যর্থতা, চিরকালই ওকে আমার পছন্দ মত চলতে বলেছি, আজ ও যা কিছু করেছে, নিজেই করেছে আজ ও নিজেই ওর সিদ্ধান্ত নেবে সেই অধিকার আমি হারিয়েছি
এ কথা বলেই কাঁদতে থাকলেন স্বপ্নিল বলে,
- বাবা-মার আশীর্বাদ সর্বদা ছিলোই এবং এখনও আছে। আপাতত তোমরা এখন আশীর্বাদ করলে আমি ঋত্বিকাকে আমার সহধর্মিনী করতে চাই বাবা
স্বপ্নিলের এই কথা শোনার পর মাঠের সকল প্রান্ত থেকে করতালির আওয়াজে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলো মঞ্চে উপস্থিত সকলে, আবাসন ও পাড়ার সকল শুভানুধ্যায়ী মানুষ আজ স্বপ্নিলকে করতালীর ধ্বনিতে আশীর্বাদ জানালো     

প্রকাশিতঃ –
“আমাদের পদক্ষেপ পত্রিকা” ব্লগ ম্যাগ... প্রথম সংখ্যা, থিম – ফিনিক্স... ০৫.০৪.২০২০          

Friday, April 3, 2020

গল্প- নিশুতির কান্না



রাজকুমার ঘোষ -

ছোট থেকেই আমি ভিতু, হ্যাঁ ভিতু। ছোট বেলায় ঠাম্মা-দাদুর কাছে রূপকথার গল্প, ভূতের গল্প, তারপর একটু বড় হতেই বিভিন্ন রহস্য গল্প বন্ধুদের মুখ থেকে শোনা বা বই পড়া সবই হতো। কেন জানিনা অবচেতন মনে হাজার রকমের রহস্য ভয় মিশ্রিত ঘটনা চলে আসতো। আমার রহস্য ভয় মিশ্রিত মন থেকে বেশ কতগুলো গা ছম ছমে ঘটনার একটি যা আজ গল্প আকারে সকলের দরবারে হাজির করছি।   
বহুদিন আগের এক ঘটনা তখন সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি তিন বন্ধু, আমি, পুলক আর আনন্দ, তিনজনের মনের মধ্যে শহরের যান্ত্রিকতা, দুষন থেকে একটু বেড়িয়ে গ্রামের কোনো একটা জায়গায় ২-৩ দিন কাটানোর ইচ্ছা ছিলো। ইলেভেনে ভর্তি হয়েছিলাম, কাজেই পড়াশোনাও শুরু করে দিয়েছিলাম। ঠিক হয়েছিলো, শীতকালের কোনো এক সময়ে ৩ দিন ছুটি কাটাতে যাবো কোনো এক গ্রামের পরিবেশে। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের এই তিন বন্ধুর কারোর বাড়ি গ্রামে নয় বা সেভাবে কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। অবশেষে, পুলকের দুঃসম্পর্কীয় কোনো এক কাকিমার বাপের বাড়ি উদয়নারায়ণপুরের কাছে জয়নগরের কোনো এক গ্রাম্য জায়গায়, সেখানে যাবো ঠিক হলো। আমরা তিন বন্ধু শীতকালে ঐ জানুয়ারীর ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে চলে গেলাম কাকিমার সেই জয়নগরের বাপের বাড়ি। বেশ পুরোনো পাকা বাড়ি। কাকিমার দাদা মানে সম্পর্কে আমার মামাই হবেন। তিনি সেই বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন না। তিনি একটি নতুন বাড়ী করেছিলেন ওনার বাড়ির কাছেই, একটা ফাঁকা মাঠ ছিলো, তার মাঝেই সেই বাড়িটা। চারিদিকে কি সুন্দর অনেক গাছ বসিয়েছেন আম, নারকেল গাছ ছাড়াও বিভিন্ন ফুলের গাছ। সত্যি! তিনজন এই পরিবেশ দেখে ভীষণ ভাবে মোহিত হয়ে পড়লাম।  
এর মধ্যেই আমার মনে এ প্রশ্ন এসে গেলো, মামা ঐ পুরনো বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন না কেন? তা ওনাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম,
‘মামা, আপনি পুরোনো বাড়িতেই তো আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারতেন, এই নতুন বাড়িতে আমাদের জন্য সব কিছু ব্যবস্থা করছেন, আপনাকে অসুবিধায় ফেলেদিলাম আমরা’...
মামা জানালো,
‘আরে দূর, কি সব বলো তোমরা, আমি খুব খুশি। তোমাদের আপ্যায়ন করতে পারলে আমার ভালোই লাগবে। দেখে নিও তোমরা, একেবারে শহরের মত ব্যবস্থা করে রেখেছি এই বাড়িতে... কোনো অসুবিধা হবে না’  
যাই হোক, সত্যিই নতুন বাড়িতে দারুণ সব আয়োজন করে রেখেছেন উনি। তারপর পেল্লাই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে গ্রামের চারিদিক দর্শন করার জন্য তিন বন্ধু বেড়িয়ে পড়লাম। আগেই বলেছিলাম, আমি ভীষন ভীতু। পুলকেরও আমারই অবস্থা, কিন্তু আনন্দ খুবই সাহসী ছেলে। গ্রামে মামার যে বাড়ি আছে মাঠের মধ্যে, সেই মাঠ ছেড়ে বাইরের রাস্তায় যাবার বা মামার পুরোনো বাড়ি যাবার মধ্যে যোগাযোগ একটা সরু রাস্তা। এই রাস্তা ছাড়াও মাঠের চারিদিকে প্রায় জঙ্গলে ঘেরাবেশ কিছুদুরে আছে একটা কালী মন্দির এবং তার সাথে লাগোয়া একটা শ্মশান। আমার আর পুলকের তো বেশ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। সামনেই শ্মশান তার মানে রাতের বেলায় তেনাদের উপদ্রব হবে না তো! কি করতে যে মামা এই নতুন বাড়িতে শোবার ব্যবস্থা করলেন কে জানে। সেদিন রাতে খাবার খেয়ে রাত এগারোটা নাগাদ শুয়ে পড়লাম। মামা বলেছিলেন যে তিনজন চাইলে আলাদা তিনটে ঘরে আমরা থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি বা পুলক চাইনি। পুলকই বললো, ‘না মামা, আমরা একসাথেই এক ঘরে থাকবো’। মামাকে আমাদের ভয়ের ব্যাপারটা না জানানোই ভালো। আমার ঘুম এলোনা। আনন্দ দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। বোধ হয় পুলকেরও ঘুম আসেনি। মনের মধ্যে বারেবারে ঘুরপাক খাচ্ছে শ্মশানের ছবিটা। আর ভাবছি এই বুঝি তেনারা এসে আমাদের ঘাড় মটকাবে। এই ভাবতে ভাবতে একটু আচ্ছন্ন এসেছে। হঠাৎ গভীর রাতে মনে হচ্ছে একটা মেয়ে কন্ঠের হাসি দূর থেকে ভেসে আসছে, তারও একটু পরে দেখি ক্ষীন কন্ঠে করুণ কান্নার শব্দ আসছে। এই শুনে আমাদের পিলে চমকানোর অবস্থাচোখ বন্ধ রেখেও রাখতে পারলাম না। চোখ খুলতেই দেখি মুখের সামনে একটা মুখ। আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়ে চিৎকার করে উঠলাম, ‘কে রে?’। পুলকও চেল্লিয়ে বললো, ‘আমি রে’... ও বললো, ‘ভয়ে ঘুমোতে পারছি না। কি একটা হাসি আর কান্নার আওয়াজ আসছে’। আমাদের আওয়াজে আনন্দর ঘুমের দফা-রফা। সে উঠে লাইট জ্বালিয়ে বললো, ‘কি হলো রে তোদের? আচ্ছা ভীতুর ডিমের পাল্লায় পড়া গেলো তো’। আমরা আনন্দকে জানালাম এই আওয়াজ নিয়ে। খানিকক্ষণ তিনজন চুপ করে থাকলাম। তারপর আমরা সকলেই কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি আনন্দকে বললাম,
‘বিশ্বাস হচ্ছিলো না তো। এবার তুইও শুনতে পাচ্ছিস... বল, এবারে কি বলবি তুই?’
আনন্দ বললো, ‘আরে কোথায় একটা মেয়ে কাঁদছে, এই নিয়ে অত ভাবার কি হলো! এখন ঘুমোতো। কাল সকালে মামাকে জিজ্ঞেস করে নেবোএখন প্লিজ আমাকে ঘুমোতে দে’
আনন্দ ঘুমিয়ে পড়লো আবার। আমি আর পুলক পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা। সকাল বেলা ৮টার সময় মামার ডাকে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মামার সাথে আরও দুজন কাজের লোক এসেছেন আমাদের চা আর জল-খাবার নিয়ে। পুলকই একটু সাহস নিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মামা, এখানে কি ভূতের ভয় আছে? কাছেই তো শ্মশান তাই জিজ্ঞেস করছি’। মামা আমাদের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালেন, তারপর ‘হো...হো...হো’ করে অট্টহাস্যে হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমরা শহরের ছেলে হয়ে কি ভূতের কথা বলছো গো ভাগ্নেরা... কাছে শ্মশান আছে তো কি হয়েছে?... এইসব ফালতু চিন্তা করো না... ভালোভাবে গ্রাম ঘুরে আনন্দ করো’আমি বললাম, ‘গতরাত্রে একটা মেয়ে হাসি তারপর কান্নার আওয়াজ পেলাম যে’ ...
মামা এরপর বললেন, ‘তো কি হয়েছে? একদম বাজে চিন্তা করো না। ও কিছু না। কে না কে হাসছে বা কাঁদছে তাতে তোমাদের আনন্দের মাটি হওয়ার কিছুই নেই। বাদ দাও সব। এখন হাত মুখ ধুয়ে চা জলখাবার খেয়ে যাও ঘুরে এসো। কাছাকাছি দুই তিনটে মন্দির আছে... বেলায় খাওয়ার সময় আবার দেখা হবে’।
অগত্যা, আমি আর পুলক আশাহত হলাম। আনন্দ আমাদের তো গিলে খাবে। বললো, ‘কি ভীতুরে তোরা, তোরা আমার বন্ধু, ভাবতেই অবাক লাগে’।
আমরা চা-জলখাবার খেয়ে নিয়ে সেদিন গ্রামের রাস্তা দিয়ে অনেক পথ হাঁটলাম। সুন্দর গ্রামের পরিবেশ, নির্মল হাওয়ার আস্বাদ পেলাম। মামার কথা অনুসারে এখানে কতগুলো পুরনো মন্দির ছিলো দেখলাম। বিশেষ করে শ্মশানের পাশে কালীমন্দির আমি আর পুলক বেশ ভালো করে দেখলাম। আর শ্মশানের চারিদিক ভালো করে দেখতে থাকলাম। আনন্দ সেটা টের পেয়ে আমাদের বললো, ‘আজ রাতে তোদের দুজনের ঘাড় মটকাবে সেই মেয়েটা, দেখে নিস’ বলেই ‘হা...হা...হা’ করে হাসতে লাগলো। কিন্তু শ্মশানের আশেপাশে আমরা কিছুই পেলাম না। যাই হোক সেদিনের মত আমরা দুপুর বেলায় ফিরে খাওয়ার টেবিলে চলে এলাম। মামার পুরোনো বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার সুন্দর আয়োজন করেছে। খাসির মাংস, গলদা চিংড়ির মালাইকারি সহ আমাদের ভোজন দারুণ হলো। সাথে পায়েস, দু-তিন রকমের মিস্টি... দুর্দান্ত রান্না। পেট পুরে খাওয়ার পর আমরা চলে এলাম নতুন বাড়িতে। এসেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সেদিনের মত আর বেড়োয়নি। বাড়িতেই কাটালাম আমরা। মামা আর তার কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন, তাদের সাথে তাসের আড্ডা জমে গেলো। রাত্রি হতেই আমরা হালকা ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম কোথায় আমার চোখে? পাশে পুলকের অবস্থাও আমার মতোই। ওকে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে ঘুমাসনি?’ ও বললো, ‘ধুস, ঘুম আসবে কি করে? শুধু শ্মশানের কথা মনে পড়ছে’দুজনে মিলে অন্ধকারে বসে আছি আর নিজেদের মধ্যে মৃদু স্বরে কথা বলছি। আর আনন্দের নাকের ডাক শুনছি। রাত বাড়ার সঙ্গে চারিদিকের নিস্তব্ধতা আরও বাড়তে লাগলো। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ কানে আসতে লাগলো। সেই সকল নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে হঠাৎই গতকালের সেই মেয়ের কন্ঠে হাসি এবং তারপরের কান্নার আওয়াজ আসতে লাগলোআমরা দুজনে আতংকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। অজান্তেই আমরা দুজন চেঁচাতে লাগলাম। আমাদের চেল্লানোয় আনন্দের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ও বলল, ‘কি জ্বালা বলতো তোদের নিয়ে? নিজেরাও ঘুমোবি না আর আমাকেও ঘুমোতে দিবি না। আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে দেখছি। চল জামা কাপড় পড়ে নে। কোথায় তোদের ভয় দেখবো আমি’ এই বলে আনন্দ লাইট জ্বালিয়ে জামা কাপড় পড়ে নিলো। আমরা না চাইলেও ওর কথায় জামা কাপড় পড়ে নিলাম। আনন্দ ভীষণ রাগি, তাই বাধ্য হয়ে আমরা ওর কথা অনুযায়ী জামা কাপড় পড়ে রাতের অন্ধকারে এই অপরিচিত গ্রামের রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লাম। হাতে একটা টর্চ নিলো আনন্দ। বাড়ির সামনে সরু রাস্তা দিয়ে আমরা এগোচ্ছি। তার খানিকবাদে জঙ্গল, রাতের অন্ধকারে জঙ্গলটাকে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল দৈত্যের মুখ। ভয়ে ভয়ে আমি আর পুলক আনন্দের পিছু পিছু এগোচ্ছি। বিশেষ করে ঐ কান্নার আওয়াজ শুনে আমরা এগোচ্ছি। জঙ্গল পার হয়ে আমরা এবার চলে এলাম কালীমন্দিরের কাছে, তারপর শ্মশান। সেখানে এসে দেখি সেই কান্নার আওয়াজটা আরও জোরালো হয়েছে। আনন্দ সেই আওয়াজের সূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে। আমদের অবস্থা শোচনীয়। ভয়ে চেঁচাতে চাইলেও চেল্লাতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন বুকের মধ্যে আধ মন পাথর কে যেন চাপিয়ে দিয়েছে। সেই পাথর বয়ে বেড়াচ্ছি এই ঘন অন্ধকার রাতে। আনন্দ এগিয়ে চলেছে আর আমরা তার পেছনে। ক্রমশঃ ঐ আওয়াজের সন্নিকটে আসছি আমরা। শ্মশান পেড়িয়ে আরও একটি সরু রাস্তা, রাস্টার দুই পাশে ঘন জঙ্গল। অন্ধকারে সেই ভয়ার্ত পরিবেশে নিজেকে অসহায় লাগছে। আমি আর পুলক সেই ভয়ার্ত পরিবেশে নিজেদের আত্মসমর্পন করে দিয়েছি। কিন্তু আনন্দের সেইদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। অদম্য ওর মনের জোর। ও খুঁজে বের করবেই, কি এমন রহস্য এই আওয়াজের পেছনে। হাতে টর্চ নিয়ে ও এগিয়ে চলেছে আরও সামনে দিকে। রাস্তা পেরিয়ে চলে এলাম আমরা একটা জলা জমির মাঝে। দেখলাম একটা কুঁড়ে ঘর আছে সেখান, হালকা আলোর রশ্মি বেড়িয়ে আসছে সেই ঘর থেকে। মনে হচ্ছে আওয়াজটা সেই ঘর থেকেই আসছে। আনন্দ দেখলাম ঘরটাকে দেখেই ছুটতে লাগলো। ও বললো, ‘পেয়েছি... পেয়েছি... তোদের পেত্নীর খোঁজ পেয়েছি’। আমরাও ওর পেছন পেছন দৌড়তে লাগলাম ঘরটাকে উদ্দেশ্য করে। ঘরের কাছে আসতেই শুনতে পেলাম মেয়েলি কন্ঠের সেই ভয়ার্ত কান্না। আনন্দ সেই ঘরের দরজায় টোকা মারলো। আমরা ভাবছিলাম এখান থেকে পালাই যেদিকে মন চায়। আনন্দের ঘাড় মটকে খাক পেত্নী। ওর সাহস ওর কাছেই থাক। কিন্তু ঘরের দরজায় জোরে জোরে টোকা মারলেও দরজা কেউ খুলছে না। আনন্দ এবার বজ্রকন্ঠে বললো, ‘কে আছেন ঘরে, খুলুন বলছি’। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম দরজাটা খুলে গেলো। অন্ধকারে একটা মানুষ বেরিয়ে আসছে। আনন্দ তার মুখে টর্চ জ্বালিয়ে বললো, ‘কে তুমি?’ আমরা তো ভয়েই চোখ বন্ধ করে দিয়েছি। দেখলাম একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো, ‘আমি নিতাই গো বাবু, কিন্তু এত রাতে আপনারা এখানে কি করছেন বাবুরা?’ চোখ খুলতেই দেখি একজন রোগা পাতলা মানুষ, লুঙ্গি পড়ে আছে। যার নাম নিতাই। সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আনন্দ বললো, ‘এত রাতে কে কাঁদছে এখানে? আমরা আসছি সেই শ্মশানের পাশে যে বাড়িটা আছে সেখান থেকে। তোমার ঘর থেকে এই হাসি-কান্নার আওয়াজ আসছে আর আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। হচ্ছেটা কি? রাতের বেলা যত ইয়ার্কি!’ জবাবে নিতাই বললো, ‘আজ্ঞে বাবু, কিছু মনে করবেন না। আমার বউটা এক্কেবারে পাগল হয়ে গেছে, রাত হলেই ওর পাগলামীটা বাড়ে... আসলে তোমাদের মত একটা ছেলে ছিলো আমাদের। এক মাস হলো ছেলেটা সাপের কামড়ে মারা গেছে বাবু... আমার বৌটা তারপর থেকে পাগল হয়ে গেছে, কি করবো বলতে পারেন?’ আমরা আর কথা বাড়ালাম না। সেখান থেকে তড়িঘড়ি চলে এলাম বাড়িতে। হঠাৎই যেন চোখের সামনে কত কি ভেসে এলো বলে মনে হলো। মুহূর্তের ভাবনায় আমাদের চোখে কখন ঘুম চলে এলো জানিনা। সকাল ৯টায় মামা এসে দরজার কড়া নাড়তেই আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মামা আসতেই গতকালের রহস্য উদ্‌ঘাটনের ঘটনা সবিস্তারে জানালাম তাঁকে। মামা শুনে রীতিমত বাহবা দিলেন আমাদের সকলকে। বললেন,
‘তোমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য সার্থক তবে বলো। একটা দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হলো তোমাদের। তোমরা যেদিন বললে ঐ কান্নার আওয়াজটা সম্বন্ধে। আমি তোমাদের এড়িয়ে গেছিলাম, কিছুই জানাইনি আমি। যাই হোক খুব ভালো লাগলো তোমাদের সাহস দেখে’।
পুলক বললো, ‘আমাদের অত সাহস নেই মামা... এখানে যা কৃতিত্ব সবই আনন্দের। ঐ আমাদের হীরো। পড়াশোনা বলো, খেলাধুলা বলো আর দুঃসাহসিকতা বলো... আনন্দ আমাদের হীরো’।
আনন্দ বলে, ‘আরে এই অভিযান আমাদের সকলের’।
মামা বললেন, ‘নিতাইয়ের একটা ছেলে ছিলো তোমাদের বয়সী, একমাস আগে সাপের কামড়ে ছেলেটি মারা যায়, তারপর থেকে নিতাইয়ের বৌ পাগল হয়ে যায়। রাত হলেই বৌ টা হাসতে থাকে, তারপর কান্নাকাটি করে। একমাত্র ছেলেতো, শোকে দুঃখে পাগল হয়ে গেছে। আর একটা কথা যে রাস্তা দিয়ে তোমরা ওদের বাড়িতে গেছো, সেই রাস্তা মোটেই ভালো না... কারণ ঐ রাস্তাতেই নিতাইয়ের ছেলে সাপের কামড়ে মারা যায়। ঐ রাস্তায় সাপের উপদ্রব ভীষণ। বলতে গেলে ঐ রাস্তা দিয়ে কেউ যায়না। তোমরা ঐ রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসেছো মানে অসাধ্য সাধন করেছো। যদিও সাপের উপদ্রব দিনের বেলাতেই বেশি। কিন্তু তোমাদের সাহসিকতার কথা যতই বলি ততই কম হবে। খুব খুশি আমি। এইভাবে তোমরা এগিয়ে চলো’। সেদিন আমরা বেলার লাঞ্চে মহাভোজ করে বিকেলের ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে এলাম।  
আজও রহস্য বা অ্যাডভেঞ্চারের কোনো ঘটনা বলতে গেলে আমার স্মৃতির দোরগোরায় চলে আসে এই ঘটনাটা। এখনও যোগাযোগ আছে আমাদের তিন বন্ধুর সাথে। পুলক আর আমি আমাদের জায়গাতেই আছি। আমরা একই অফিসে চাকরী করি। মোবাইলে, ফেসবুকের মাধ্যমে আনন্দের সাথে যোগাযোগ আছে। ও এখন মিলিটারিতে আছে কর্ণেলের পদে। কখনও কাশ্মীর, কখনো বাংলাদেশের বর্ডার, কখনও কার্গিল, এইভাবে ওর ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। ওর অসীম সাহস ছিলো, এই ধরণের পদই ওর জন্য যোগ্য। ও আমাদের গর্ব। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে এই ধরণের একটি ঘটনায় ওর সাথে আমরা ছিলাম।             

প্রকাশিতঃ ASPIRATION MAGAZINE, BPIE COLLEGE… BISHNUPUR, 2019