মাঝরাতে হাতছানি
রাজকুমার ঘোষ
স্বপ্ননীল ঘোষ, লেখক হিসাবে বেশ নাম ডাক হয়েছে। বেশ কয়েকটি উপন্যাস, গল্প এমনকি কাব্যগ্রন্থ পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে সবই প্রেম, বিরহ, বেদনা, সামাজিক, পারিবারিক বিষয় নিয়ে লেখা। খুব জোর সাসপেন্স থ্রিলার নিয়ে তিন-চারটে গল্প লিখেছেন। কিছুদিন যাবৎ একটি প্রকাশনা সংস্থা তাদের ভৌতিক সংকলনের জন্য ওনার থেকে ভৌতিক ব্যাপার নিয়ে লেখা চেয়েছে। সংকলনের নামকরণ হবে “মাঝরাতের হাতছানি”। স্বপ্ননীলবাবু বেশ ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। প্রকশনী সংস্থা থেকে জোর অনুরোধ এসেছে একটা গল্প লিখতেই হবে। আগের সকল সংকলনে ওনার লেখা ছিল। কাজেই এবারেও ভূত নিয়ে তাদের লেখা চাই...চাই।
কিন্তু লেখক মহাশয় সেভাবে ভূতের গল্প কোনোকালেই লেখেননি। বলা ভালো অপার্থিব বিষয় নিয়ে ওনার লেখা আসে না। তবে ভূতের গল্প পড়েছেন বা সিনেমাও দেখেছেন, হয়তো ভয়ও পেয়েছেন। আবার খুব যে পেয়েছেন তাও না। কিন্তু ভূতের গল্প লিখতে গিয়ে কিছুতেই লেখা আসেনা। সম্পাদকের উপর রাগ দেখিয়ে মনে মনে বললেন,
“বেছে বেছে যত ফালতু বিষয়বস্তু। সম্পাদক পারেও বটে। বলে কিনা পাবলিক ডিমান্ড”
সম্পাদকের আজ্ঞবহ হয়ে যথারীতি ভূতের গল্প লেখার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছেন। একে একে গা ছমছম করা বনে বাদাড়ে, নিঃশব্দ, নিঃস্তব্ধ গ্রামের মধ্যে পোড়ো বাড়ি থাকলে সেখানেও গিয়েছেন, এমনকি বেশ কিছু মন্দিরে পুজো দিয়েছেন যাতে করে জম্পেশ দু-চারটে ভূতের গল্প লিখতে পারেন। তবুও একটা ভূতের গল্প এল না। শুধু মানুষ ভূতের কথা লেখায় চলে আসে। নিজের উপর স্বপ্ননীলবাবুর বিরক্তি চলে আসছে। এমনকি গতকাল রাত দু’টো পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন কিন্তু না, ভূত নিয়ে একটা শব্দও আসেনি। মনে মনে বললেন,
“দূর ছাই, আর লিখবো না। সম্পাদক যা বলার বলবে, রাগ করলে করবে। যাই, ভালো করে ঘুমোতে যাই। তার চেয়ে আগামীকাল সকাল থেকে আমি আমার স্বাভাবিক সত্ত্বায় ফিরে আসব। কবিতা এবং ছোট-বড় বিভিন্নরকম গল্প নিয়েই না হয় আমি নিজের ছন্দে নিমজ্জিত থাকব। এইসব অবাস্তব বিষয় একদম না!”
এরপর স্বপ্ননীলবাবু স্টাডি রুমের লাইট নিভিয়ে বাড়ির দোতলায় শোবার ঘরে যাবার আগে একটু বাথরুমেও ঘুরে এলেন, হ্যাঁ অবশ্যই অন্ধকারে, তারপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাড়ির ছাদেও গেলেন। বাড়ির ছাদের আকাশ আজ যেন ঘন কালো। কিছুদিন আগে কালীপুজো চলে গেছে। জগদ্ধাত্রী পুজোও কেটে গেছে। বেশ শীতের আমেজ আসছে। গায়ে একটা পাতলা জামা পড়ে আছেন। ছাদের আশেপাশে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারকেই ভেবে নিলেন একটা ছায়ামূর্তি যেন ওৎ পেতে বসে আছে ওনাকে ভয় দেখাবে বলে। সিনেমায় দেখা একটা ভৌতিক মুখ কাল্পনিক ভাবে ওনার মনে ছকে নিয়ে নিজের মনেই বললেন,
“কিরে ভূত, আমার ঘাড় মটকাবি নাকি? সাহস থাকলে সামনে আয় দেখি, কেমন তোর সাহস?”
কিন্তু অসফল প্রচেষ্টা। তেনাদের কারোর দেখা নেই। ভাবলেন তেনাদের কোনো প্রতিনিধি এসে একটা ভূতের গল্প লেখার প্লট দেবে। এরপর নিজের অজান্তেই ছাদের একটা ধারে দাঁড়িয়ে বেশ দূরে একটা পোড়ো বাড়ি আছে, সেইদিকে তাকিয়ে রইলেন। যেখানে দীর্ঘদিন কেউ বাস করেনি। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলার সময় সেই বাড়িতে গিয়ে অনেকবার লুকিয়েছেন। সেই বাড়ির দিকে তাকিয়েই উনি টাটা করে হাঁকলেন,
“টাটা গো অন্ধকারের মানুষজন, পারলে আমাকে ভয় দেখাও দেখি! যদি কিছু মনের মধ্যে গল্প চলে আসে। আর তাও যদি তোমার সম্মানে লাগে। কাছে এসে ঘাড় মটকিয়ে দেখাও দেখি!”
কিন্তু কোথায় কি? স্বপ্ননীলবাবু হতাশ হয়ে কালো অন্ধকারে হাতরে হাতরে নিজের শোবার ঘরে ঢুকে পড়লেন। তারপর ঘরের কম পাওয়ারের লাইট জ্বেলে অভ্যাসবশত বিছানার পেছনের দিকে রাখা আয়নায় নিজের মুখমন্ডলটি দর্শন করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কিন্তু হঠাৎই তার মনে হলো,
“সত্যি তো! আয়নায় আমি কী দেখলাম? আমি কি আমার মুখের অবয়ব সত্যি কি দেখতে পেলাম!”
এবার কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করলেন। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। না চাইলেও একটু একটু ভয় পেতে থাকলেন। ওনার মনে হলো,
“আয়নার যখন নিজের মুখ দেখতে গেলাম, কিছুই দেখতে পেলাম না। কি জানি, মনের ভুল হবে বোধ হয়”
হালকা গা শিরশিরানি শীতেও ওনার গায়ে বেশ ঘাম চলে এল। জল পান করতে গিয়ে জলের বোতলটি তুলতে গিয়েছেন, কিন্তু কিছুতেই তুলতে পারছেন না। বোতলটি তোলার ব্যর্থ প্রচেষ্টা!
“কি হলো আমার সাথে? কিছুই মাথায় ঢুকছে না। সব মাঝরাতের হাতছানি নাকি। এমন তো কোনোদিন হয়নি। ভূতের গল্প লেখা মাথায় থাক বাবা... আর নয়। অনেক হয়েছে”
স্বপ্ননীলবাবুর শিড়দাঁড়া দিয়ে যেন হালকা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন বিকল হয়ে যাচ্ছে। উনি ঘরের লাইট জ্বালাতে গেলেন। কিন্তু কেমন যেন দুর্বল লাগলো। সামান্য সুইচও অন করতে পারছেন না!
“হলো কী আমার?” নিজের মনেই জিজ্ঞেস করে অনুভব করলেন নিজের হৃদস্পন্দনের মৃদু আওয়াজ হঠাৎ শব্দ সহকারে কানের মধ্যে প্রবেশ করছে। উনি ভয়ে কানে হাত দিয়ে দিলেন। এদিক ওদিক ভাবতে ভাবতে পরিশেষে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লেন, মনে হলো ওনার লাশটা ঝুপ করে আওয়াজ করে টলে পড়ল বিছানায়। চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা বনবন করে কি যেন ঘুরতে থাকা চাকতির মতো, তীক্ষ্ম শব্দে ওনার মাথাকে আরও ভারী করে দিচ্ছে। ওনার কিছুই ভালো লাগছে না। শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভূত হছে। এরপর আচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লেন।
কিন্তু এক ঘন্টা পর ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গিয়ে ওনার মনে হলো বাড়ির লোকজনের ভয়ার্ত গলা। বেশ শোরগোল। সবাই কেন চেল্লাচ্ছে বুঝতে পারছেন না। ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির নিচে চলে এলেন ওনার স্টাডি রুমের কাছে। দেখলেন, বাড়ির সবাই সেই ঘরে হাজির। বেশ কিছু প্রতিবেশীও এসেছে। সবাইকে কাঁদতে দেখে ভীষণ চিন্তিত হয়ে বাড়ির অন্যঘর গুলো দেখলেন। সেই ঘরগুলোয় কেউ নেই। বাবা-মা’কে দেখতে না পেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। আবার স্টাডি রুমে ফিরে এসে দেখলেন বাবা-মা কাঁদছেন। তাহলে কার কি হল? সকলে কাঁদছে কেন? অবাক করার মত ব্যাপার, কাউকে ঠেলতে হলো না। স্বপ্ননীলবাবু সবাইকে ভেদ করে স্টাডি রুমের মধ্যে এসে একটু উঁকি দিতেই ওনার চক্ষু চড়ক গাছ! মনে মনে বললেন,
“একি দেখছি আমি?”
ওনার গা হাত পা ঠান্ডা হওয়ার উপক্রম। দেখলেন, ওনার নিস্তেজ দেহটা পড়ে আছে স্টাডি রুমের ঘরে। আর সেই দেহটি আঁকড়ে ধরে আছে ওনার বোন। ডাক্তার নাকি আগেই এসে দেখে গেছে। সকলের বলাবলিতে জানতে পারলেন, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে ওনার মৃত্যু ঘটেছে।
সমস্ত ব্যাপারটা প্রত্যাশিত না, কাজেই এমন একটা মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে ওনার মাথাটা কেমন যেন বনবন করে ঘুরতে লাগল। স্বপ্ননীলবাবুর এবার বেশ ভয় ভয় করছে। নিজেকে বেশ অসহায় মনে হচ্ছে। সামান্য ভূতের গল্পই তো লিখতে চেয়েছিলেন উনি। তার পরিণতি এমন ভয়াবহ হবে তা কল্পনার বাইরে। ঠিক এমন সময় দূর থেকে একটা বজ্র কঠিন চাপা গলায় এক ছায়ামূর্তি কোথা থেকে ওনার দিকে ধেয়ে এসে বলল,
“আমাদের দুনিয়ায় মাঝরাতের হাতছানিতে সুস্বাগতম লেখক। আপনার আমন্ত্রণ না রাখতে পারলেও আশা করি আমাদের আমন্ত্রণ আপনি নিশ্চয়ই রাখবেন”
সমাপ্ত